যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি

হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র যে নৌ অবরোধ দিয়েছে তা তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরব। তাদের উদ্বেগ, এটা অব্যাহত থাকলে ইরানকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে যার ফলে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অন্য নৌপথগুলোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দেয় ইরান। এরপর গত ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে তেহরান নৌপথটি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলজুড়ে অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোতে আঘাত হানার সক্ষমতা ও ইচ্ছা উভয়ই প্রদর্শন করেছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাসভিত্তিক অর্থনীতিকে বিপন্ন করেছে।
এর মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হলেও ইসলামাবাদ আলোচনায় কোনো চুক্তি না হওয়ায় হরমুজ প্রণালীতে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র।
জানানো হয়, হরমুজ প্রণালী থেকে বা প্রণালীতে চলাচল করা সমস্ত ইরানি পণ্যবাহী জাহাজ অবরোধ করা হবে। যা গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো ইরানের আগে থেকেই পঙ্গু হয়ে থাকা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন মতে, আমেরিকার এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরব বেশ উদ্বিগ্ন যে, ইরানের বন্দরগুলো আটকে দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেয়া এই পদক্ষেপে পরিস্থিতি আরও বাজে রূপ নিতে পারে।
আরবের কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদমাধ্যমটিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।
তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো হলেও সৌদি আরব আশঙ্কা এতে উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ইরান যদি ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সহায়তায় বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে তা সৌদি আরবের তেল রফতানিতে বড় ধাক্কা হবে। লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অন্যতম প্রধান রুট।
যুদ্ধের শুরুতেই হরমুজ প্রণালী অচল করে দেয় ইরান। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের সমুদ্রবন্দরের ওপর অবরোধ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে চায় এবং এ বিষয়ে উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব বিকল্প ব্যবস্থায় তেল রফতানি করছে। মরুভূমির মধ্যে নির্মিত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের মাধ্যমে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি করছে দেশটি। কিন্তু ইয়েমেন সংলগ্ন বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে এই সরবরাহও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী এই প্রণালীর আশপাশের বিস্তীর্ণ উপকূল নিয়ন্ত্রণ করে। গাজা যুদ্ধের সময় তারা এই পথে জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। রিয়াদের আশঙ্কা, ইরান তাদের আবার সক্রিয় করতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান যদি চাপ বাড়াতে চায়, তাহলে হুথিরাই হবে তাদের প্রধান হাতিয়ার। ইতোমধ্যে ইরানের ঘনিষ্ঠ মহল থেকেও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে লোহিত সাগরের প্রবেশপথেও বিঘ্ন ঘটানো হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না, এই যুদ্ধ শেষে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকুক। তবে তারা একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেও জোর দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান থাকলেও দুই পক্ষই মধ্যস্থতার মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
বাব আল-মান্দেব এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সংযোগ। গাজা যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ৯৩ লাখ ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পণ্য এই পথ দিয়ে যেত। হুথিদের হামলার পর তা অর্ধেকে নেমে আসে।
এদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের এক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, হরমুজের মতোই বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকেও নজর রাখছে ইরান।
যদিও সৌদি আরব দাবি করেছে, তারা হুথিদের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়েছে যে, সৌদি জাহাজে হামলা করা হবে না। তবে পরিস্থিতি যে অনিশ্চিত, তা স্বীকার করেছে রিয়াদ। তাদের মতে, ইরানের চাপ বাড়লে হুথিরা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে, এমনকি জাহাজ চলাচলে নতুন করে শুল্ক আরোপও করতে পারে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যে।
ভিওডি বাংলা/এসআর







