• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

যেভাবে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাচ্ছেন খালেদা জিয়া

   ৭ জানুয়ারী ২০২৫, ০৫:০৬ পি.এম.

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক

নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে অবশেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কাতারের আমিরের পাঠানো একটি অত্যাধুনিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে মঙ্গলবার রাত ১০টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করবেন তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রী।

নানা জটিল রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়ার চেষ্টা করছিল বিএনপি। দলটি এই দাবিতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও ওই সময় সরকারের কাছে বারবার আবেদন করা হয়, কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সব দ্বার উন্মুক্ত হয়। খালেদা জিয়া মুক্তি পান। একই সঙ্গে তাঁর উন্নত চিকিৎসার প্রস্তুতি শুরু করে বিএনপি। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশ কয়েকবার তারিখ পরিবর্তন করে অবশেষে তিনি রাতে লন্ডনে যাচ্ছেন। 

বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার জানান, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সব কিছুর অবসান ঘটিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ ৭ জানুয়ারি ২০২৫ মঙ্গলবার রাত ৮ টায় গুলশানের বাসভবন ফিরোজা থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়ার এই বিদেশযাত্রার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে সাত বছর পর লন্ডনে তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা হবে। যাত্রাপথে কাতারে এক ঘণ্টার বিরতি থাকবে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে চিকিৎসক, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সফরসঙ্গী হবেন মোট ১৫ জন। 

বুধবার স্থানীয় সময় ভোরে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন খালেদা জিয়া। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানাবেন বড় ছেলে তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার যাবতীয় বিষয় দেখভাল করবেন তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী। 

এর আগে ২০১৬ সালে সবশেষ ছেলেকে সশরীরে সামনে পেয়েছিলেন মা খালেদা জিয়া। ওই বছর ৯ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রাজকীয় আমন্ত্রণে সপরিবারে ওমরা পালন করেছিলেন তারা। এরপর আট বছর কেটে গেছে। এই সময়ের মধ্যে আর কখনো তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা হয়নি খালেদা জিয়ার। 

খালেদা জিয়ার এই চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়াকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ কাজ করছে। জেলজীবনের একাকিত্ব ও সুচিকিৎসা না দিয়ে পতিত শেখ হাসিনার সরকার খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলো বলে অভিযোগ করে আসছেন দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। 

শারীরিক সুস্থতার জন্য দেশবাসী যে বিভিন্ন সময় দোয়া করেছেন, সেজন্য খালেদা জিয়া দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, আগামীতে যাতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থভাবে দেশে ফিরে আসতে পারেন তার জন্য ম্যাডাম দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনিও দেশবাসীর জন্য দোয়া করছেন।

তিনি জানান, লন্ডন ক্লিনিকে হবে তাঁর চিকিৎসা। চিকিৎসকরা প্রয়োজন মনে করলে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রেও নেয়া হতে পারে।  

কাতারের রাজধানী দোহা হয়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নামার পর খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘লন্ডন ক্লিনিকে’ ভর্তি করা হবে। সেখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাই বিএনপি নেত্রীর চিকিৎসার বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত নেবেন।

লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি ও উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিকসহ নানা রকম অসুখে ভুগছেন  ৭৯ বছর বয়সী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার বিদেশে যাওয়ার আবেদন করা হলেও, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বাধায় সেটি হয়নি। 

ডা. জাহিদ বলেন, লন্ডন ক্লিনিক নামে একটি পুরানো হাসপাতাল আছে, সেখানে ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) ভর্তি করানো হবে এবং চিকিৎসা চলবে। এই হাসপাতালে ম্যাডামের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে। তাদের পরামর্শে চিকিৎসার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মাল্টিডিসিপ্লিনারি এই হাসপাতালে সব ধরনের ব্যবস্থা আছে।

খালেদা জিয়ার লিভার ট্রান্সপ্লান্ট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. জাহিদ বলেন, ম্যাডামের যে বয়স এবং তাতে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিটে যাওয়ার পর এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে, সেখানে (লন্ডন ক্লিনিকে) এই সুবিধা আছে। সুতরাং তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়ে। 

আমেরিকায় চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি তারা (লন্ডন ক্লিনিক) সুপারিশ করে যে তাঁকে নিতে হবে, তাদের এখানে ব্যবস্থা নেই; জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি হাসপিটালে নিয়ে যেতে হবে, তখন হয়তো যাওয়ার একটা প্রশ্ন আসে।

খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ ও উদ্দীপনা কাজ করছে। বিমানবন্দরে খালেদা জিয়াকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। বিএনপি নেত্রী যে পথ দিয়ে বিমানবন্দরে যাবে তার দুপাশেই থাকবেন দলটির নেতা-কর্মীরা।

এর আগে গত রোববার রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। জানা গেছে, সেই সাক্ষাতে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। শীর্ষ নেতারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করেন। শত জুলুমের পরও তিনি যে ভেঙে পড়েননি তা তুলে ধরে দ্রুত চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

এদিকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বিএনপি চেয়ারপারসনের অসুস্থতার খবরে যে রাজকীয় উড়োজাহাজ পাঠিয়েছেন, তাতে আইসিইউসহ সর্বাধুনিক চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে। ছয়জন চিকিৎসক, নার্স ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে থাকবেন। 

সম্ভাব্য জরুরি প্রয়োজনে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি প্রস্তুত রয়েছে আরেকটি উড়োজাহাজ। ফ্রান্সের এয়ারবাসের তৈরি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা থেকে দোহা হয়ে লন্ডন যাবে। সেখানে হিথ্রো বিমানবন্দরে খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানাবেন তারেক রহমান।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১০টায় বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্স যাত্রা করবে। কাতারের চারজন চিকিৎসক ও প্যারামেডিকসরা থাকবেন। ঢাকা থেকে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের ছয় সদস্য বিমানে যাবেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর ছোট ছেলের স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান, উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল এবং একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ কয়েকজন সঙ্গে যাবেন।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের উন্নত চিকিৎসা সক্ষমতা তুলে ধরে এটিকে ফ্লাইং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, উড়োজাহাজটি জরুরি অবস্থায় সর্বাধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তিতে সজ্জিত, যা ট্রানজিটের সময় রোগীর নিরবচ্ছিন্ন যত্ন নিশ্চিত করে। 

এই এয়ারবাসে ভেন্টিলেটর, ডিফিব্রিলেটর, ইনফিউশন পাম্প এবং উন্নত কার্ডিয়াক মনিটর রয়েছে। এটিতে চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে, যা বিভিন্ন জরুরি অবস্থায় চিকিৎসার প্রস্তুতি নিশ্চিত করে। প্রশস্ত কেবিন, চিকিৎসা কর্মীদের নির্বিঘ্ন চলাচলের সুবিধা ছাড়াও জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসায় সেবা দিতে সক্ষম।

যাত্রা পথে সেবা নিশ্চিত করতে বিমানটিতে চার চিকিৎসক ও প্যারামেডিকসহ কাতারের রাজকীয় মেডিকেল ইউনিটের একটি টিম রয়েছে। এই বিশেষজ্ঞরা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট থেকে ট্রমা কেস পর্যন্ত জরুরি পরিস্থিতি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারদর্শী। পুরো যাত্রা পথে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। 

খালেদা জিয়ার গাড়িবহর কোন পথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাবে, ইতোমধ্যেই সেই রুটের তথ্যও জানানো হয়েছে। সোমবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রুটের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, গুলশান-২ নম্বরের বাসা ফিরোজা থেকে রাত ৮টায় চেয়ারপারসনকে নিয়ে গাড়িটি গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বর হয়ে কাকলী গোলচত্বর হয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাবে।

এর আগে, খালেদা জিয়াকে বহনকারী কাতার আমিরের বিশেষ বিমান রয়েল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি’ ঢাকায় এসে পৌঁছায়। সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি অবতরণ করে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বিমানবন্দরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার সমম্বয়ে বৈঠক করেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। কর্মকর্তারা জানান, বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর জমায়েতে যাতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য বিশেষ এই সতর্কাবস্থা। 

বিমানবন্দর থানার ওসি তাসলিমা আক্তার জানান, ১০ প্লাটুন পুলিশ থাকবে। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বেবিচকের এ্যাফসেক বাহিনীসহ সোয়াটের মতো স্পেশাল টিমও থাকছে। বেবিচক চেয়ারম্যান জানান, বিমানবন্দরে নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা যাতে না হয়, সে লক্ষ্যে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে প্রবেশে কড়াকড়ি থাকবে।

ভিওডি বাংলা/ এমএইচপি


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৭০ শতাংশ খালাস, সাজার হার ৩ শতাংশ!
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৭০ শতাংশ খালাস, সাজার হার ৩ শতাংশ!
ডিসি সম্মেলন শুরু হচ্ছে কাল : আলোচনায় উঠছে ৪৯৮ প্রস্তাব
ডিসি সম্মেলন শুরু হচ্ছে কাল : আলোচনায় উঠছে ৪৯৮ প্রস্তাব
বাস্তবতা এখনো জটিল, অনিশ্চয়তার অন্ত নেই
আজ মহান মে দিবস বাস্তবতা এখনো জটিল, অনিশ্চয়তার অন্ত নেই