বিশ্ব ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ডুবে মৃত্যু কমাতে সাতটি কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে নতুন একটি বৈশ্বিক রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। একই সময়ে বাংলাদেশে শিশু ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সরকারি কর্মসূচি-কমিউনিটিভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্র এবং সুইমসেইফ-দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
'প্রোটেক্ট' শীর্ষক এই কারিগরি নির্দেশিকায় ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সাতটি প্রমাণভিত্তিক কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। তা হচ্ছে-ছোট শিশুদের জন্য তত্ত্বাবধানভিত্তিক শিশুযত্ন, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের সাঁতার ও জলনিরাপত্তা শিক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পানি অবকাঠামো গড়ে তোলা, নিরাপদ উদ্ধার ও কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) প্রশিক্ষণ, নৌযান নিরাপত্তা জোরদার এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক ড. তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন, "প্রতিটি ডুবে মৃত্যু একটি ট্র্যাজেডি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রোটেক্ট কৌশলগুলো দেশগুলোকে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর উপায়ে ডুবে মৃত্যু কমানোর সুযোগ দেবে।"
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। এসব মৃত্যুর ৯০ শতাংশের বেশি ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে, যা ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকিও বৃদ্ধি করছে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাস্তবতা:
ডব্লিউএইচওর নতুন রোডম্যাপ এমন সময় প্রকাশিত হলো, যখন বাংলাদেশে শিশু ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় দেশের প্রায় ৮ হাজার ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেইজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রোটেকশন অ্যান্ড সুইমসেইফ (আইসিবিসি) এবং ১ হাজার ৬০০ সুইমসেইফ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
এর ফলে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় দুই লাখ শিশু কমিউনিটিভিত্তিক শিশুযত্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার স্কুলপড়ুয়া শিশু সাঁতার ও জলনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না। বর্ষা মৌসুমে এ পরিস্থিতি ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২২ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মাধ্যমে আইসিবিসি প্রকল্প চালু হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা এবং জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শেখানোর লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। তবে প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর নতুন পর্যায়ের অনুমোদন না পাওয়ায় কর্মসূচিটি বন্ধ রয়েছে।
সতর্কবার্তা:
সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুর জামান বলেন, ডব্লিউএইচওর কাঠামো বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ হতে পারে।
তার মতে, "সাতটি উদ্যোগই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কমিউনিটিভিত্তিক শিশুযত্ন ও নিরাপদ তত্ত্বাবধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ ডুবে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে ছোট শিশুরা।"
বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ডুবে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ লক্ষ্য অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, নিরবচ্ছিন্ন কর্মসূচি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক অংশীজন সংলাপে সমষ্টির গবেষণা ও যোগাযোগ পরিচালক রেজাউল হক জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৮ হাজারের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যাদের অধিকাংশই শিশু।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধকে অস্থায়ী প্রকল্প হিসেবে নয়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি স্থায়ী সামাজিক সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শুধু সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং গণমাধ্যমের অংশীদারত্বের মাধ্যমে টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ডব্লিউএইচও বলছে, ডুবে মৃত্যু কোনো অনিবার্য দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই কার্যকর নীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন এই বৈশ্বিক রোডম্যাপ আবারও মনে করিয়ে দিল, স্থগিত থাকা কমিউনিটিভিত্তিক শিশুযত্ন ও সুইমসেইফ কর্মসূচি দ্রুত চালু এবং টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ডুবে মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনার জাতীয় লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
ভিওডি বাংলা/জা









মন্তব্য