• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
logo

ভূমিকম্পের এক মাস পরও ধ্বংসস্তূপে লাশ, স্বজনের অপেক্ষায় একটি দেশ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:  ২৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৪০ পি.এম.
শেয়ার করুন 0
ছবি: সংগৃহিত
ছবি: সংগৃহিত

শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূল বিধ্বস্ত হওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও হাজারো মানুষ এখনও নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে ফিরছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে নতুন নতুন মরদেহ, আর একই সঙ্গে বাড়ছে সরকারি তৎপরতা ও নির্মাণমান নিয়ে মানুষের ক্ষোভ।

৪৯ বছর বয়সী জেলে ভিক্টর কালদেরনের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনটি শুরু হয়েছিল সমুদ্রে। টানা ১৮ দিন মাছ ধরার পর তিনি রেডিওতে জানতে পারেন, তার পরিবারের বসবাস করা বহুতল ভবনটি ধসে পড়েছে।

তীরে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, তার পরিবারের ২৬ সদস্য আর বেঁচে নেই। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তার দুই বোন, তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনি, সৎ বাবা এবং নয়জন চাচাতো-ফুফাতো ভাইবোন। নিহতদের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর থেকে সত্তরের বেশি।

ভিক্টর বলেন, "এটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এখনও আমি তাদের জন্য কাঁদিনি। যতক্ষণ না শেষ নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাই, ততক্ষণ নিজেকে সামলে রাখতে চাই।"

তার পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্য বলতে এখন কেবল মেয়ে ও নাতনি। তারা বর্তমানে একটি গলফ কোর্সে স্থাপিত অস্থায়ী তাবুতে বসবাস করছেন।

সরকারি হিসাবে, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ১৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।

সরকার এখনও নিখোঁজের আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।

সম্প্রতি কারাবাল্লেদার ওপিপিই-২৬ আবাসন প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ছিল ১১ বছর বয়সী এক কিশোরী।

এক মাস ধরে মেয়েকে খুঁজে বেড়ানো তার বাবা মরদেহ উদ্ধারের পর আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। উদ্ধারকর্মীরা কাজ থামিয়ে নীরবে শ্রদ্ধা জানান, আর বাবার কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

উদ্ধারকর্মী মাগিন হার্নান্দেজ বলেন, "এটি আত্মাকে ভেঙে দেয়। উদ্ধারকর্মী, পরিবার, বন্ধু—সবার জন্যই এটি অসহনীয়।"

ভূমিকম্পের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় গেলেও, এক মাসের মধ্যে তাদের অধিকাংশই নিজ দেশে ফিরে গেছে। এখন অনেক পরিবারকেই নিজেদের উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপে স্বজনদের খুঁজতে হচ্ছে।

কারাবাল্লেদার ওপিপিই-২৬ আবাসন প্রকল্পের ১২টি ভবনের মধ্যে ১০টিই ধসে পড়েছে। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—ভবন নির্মাণে কি ত্রুটি ছিল? নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল? নাকি কোথাও অবহেলা হয়েছে?

তবে গণপূর্তমন্ত্রী হুয়ান হোসে রামিরেজ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তার ভাষায়, "এটি ছিল প্রায় একই সময়ে সংঘটিত দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিকে আঘাত হেনেছে। এমন দুর্যোগ মোকাবিলা করা কোনো দেশের পক্ষেই সহজ নয়।"

তিনি বলেন, শুধু সরকারি ভবন নয়, আশপাশের অসংখ্য বেসরকারি ভবনও ধসে পড়েছে। "ভূমিকম্প সরকারি-বেসরকারি কোনো পার্থক্য করেনি।"

পরিবারের খোঁজে একা: উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মারের একটি বেসরকারি ভবনে ভূমিকম্পের আট দিন পর অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন নিরাপত্তাকর্মী হার্নান গিল।

কিন্তু একই ভবনের ভূগর্ভস্থ পার্কিং এলাকায় এখনও আটকে আছে লরা বারিওসের ভগ্নিপতির মরদেহ।

একসময় যে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারীরা সেখানে কাজ করছিলেন, তারা চলে গেছেন। এমনকি ধ্বংসস্তূপ সরানোর ভারী যন্ত্রও অন্য এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে লরার পরিবারের সদস্যরা তার ননদ এবং ১০ ও ৩ বছর বয়সী দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছেন। তারা নিজেদের শোবার ঘরে একসঙ্গে জড়িয়ে ছিল।

কাঁদতে কাঁদতে লরা বলেন, "কয়েক দিন আগে ভেনেজুয়েলায় শিশু দিবস ছিল। কিন্তু আমাদের উদযাপনের মতো কোনো শিশু আর বেঁচে নেই।"

তিনি বলেন, "এই ধ্বংসস্তূপই সব কথা বলে দিচ্ছে। ছড়িয়ে থাকা জামাকাপড়, ব্যবহার না করা বাসন, খেলনা—মাত্র ৩৯ সেকেন্ডে পুরো একটি জীবন শেষ হয়ে গেছে।"

দীর্ঘ পুনর্গঠনের পথ: 
দুর্যোগের পর বিভিন্ন মানবিক সংস্থা ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার, পানি ও জরুরি সহায়তা দিচ্ছে। তবু হাজার হাজার মানুষ এখনও রাস্তার পাশে অস্থায়ী তাবুতে বসবাস করছেন।

সরকার সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ২০০টি নতুন বাড়ি বরাদ্দ দিয়েছে। তবে বাস্তব চাহিদা এর বহু গুণ বেশি।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার প্রায় ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। দেশটির পুনর্গঠনে লাগতে পারে বহু বছর এবং বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ।

এরই মধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকার পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, দেশের প্রধান আয়ের উৎস তেলশিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য তাই এক মাস পরও দুঃস্বপ্নের শেষ হয়নি। অনেকের কাছে প্রতিটি দিন শুরু হচ্ছে স্বজনের মরদেহের খোঁজে, আর শেষ হচ্ছে অনিশ্চয়তা, শোক এবং অজানা ভবিষ্যতের আশঙ্কা নিয়ে।

সূত্র: বিবিসি

ভিওডি বাংলা/আরআর/আ


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
পুরনো ছবি: সংগৃহিত
টানা ১৩তম রাতেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
ছবি: সংগৃহিত
ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ সামরিক হামলার কথা ভাবছেন ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহিত
প্রশ্নফাঁসে আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা মোদির