টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে রাজধানীর কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্যের দামে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির বাজারে দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, হাতে গোনা কয়েকটি সবজি ছাড়া প্রায় সব ধরনের সবজির কেজি এখন ১০০ টাকার ওপরে। সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কাঁচা মরিচ, যার কেজি ২৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। গরুর মাংসের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও তা এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। একই সঙ্গে বেড়েছে মাছ, ডিম, মুরগি এবং পেঁয়াজের দামও। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাজধানীর মালিবাগ, রামপুরা, শান্তিনগরসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। বিক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

বর্তমানে বাজারে কচুর লতি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি, বরবটি ১২০ টাকা, করলা ১২০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে। গাজরের কেজি ১৩০ টাকা, উচ্ছে ১৪০ টাকা, শসা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, গোল বেগুন ১৬০ টাকা এবং টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা কেজিতে।
তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম দামে পাওয়া যাচ্ছে পেঁপে, যার কেজি ৪০ টাকা। চিচিঙ্গা, পটল ও ঢেঁড়স ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। লাউয়ের দাম প্রতি পিস ১০০ টাকা এবং জালি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা পিস দরে।
সবচেয়ে বেশি দাম কাঁচা মরিচের। বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে।

মালিবাগ বাজারে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী হায়দার আলী বলেন, কয়েক দিন ধরেই সবজির দাম বাড়ছিল, কিন্তু আজ এসে দেখলাম পরিস্থিতি আরও খারাপ। প্রায় কোনো সবজিই ১০০ টাকার নিচে নেই। কাঁচা মরিচ কিনতে হয়েছে ২৮০ টাকা কেজি দরে। এভাবে প্রতিদিন বাজার করা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় অনেক বিক্রেতা ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন। বর্ষাকালে কিছুটা দাম বাড়তেই পারে, তবে এমন লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ প্রয়োজন।
রামপুরা বাজারের ক্রেতা মাসুদ রানা বলেন, কয়েক দিন আগেও ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বেশ কিছু সবজি পাওয়া যেত। এখন বেশির ভাগ সবজিই ১০০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে। সবজির দামই যদি এত বেশি হয়, তাহলে মাছ বা মাংস কেনা অনেক পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
শান্তিনগর বাজারের সবজি বিক্রেতা নাজিমুদ্দিন জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। একই সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটছে। এসব কারণে পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে।
তার ভাষ্য, আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে দাম কমার সম্ভাবনা কম। তবে বৃষ্টি কমে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে সবজির দামও ধীরে ধীরে নেমে আসবে।
কয়েক সপ্তাহ আগেও ভালো মানের পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও বর্তমানে সেই পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। মাঝারি মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি। পাড়া-মহল্লার ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের কাছেও আগের তুলনায় দাম বেড়েছে।
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও দাম চড়া রয়েছে। বড় রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজিতে। পাবদার দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৬০০ টাকা কেজি।

এ ছাড়া ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি কইয়ের কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে মাঝারি আকারের রুই, তেলাপিয়া, পাঙাশ ও চাষের কইয়ের দামও কিছুটা বেড়েছে। অন্যদিকে রূপচাঁদা, নদীর বেলে ও বড় শোল মাছ কিনতে গেলে কেজিপ্রতি এক হাজার টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে।

ডিম ও মুরগির দামেও ঊর্ধ্বগতি
ডিমের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমানে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও যার দাম ছিল ১৩০ টাকা, আর দুই সপ্তাহ আগে পাওয়া যেত ১২০ টাকায়।
ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৯০ থেকে ২১০ টাকার মধ্যে রয়েছে। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজি দরে।

মাংসের বাজারেও বাড়তি চাপ
গরুর মাংসের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও তা এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা। অন্যদিকে খাসির মাংস কিনতে কেজিপ্রতি খরচ করতে হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে এলে এবং কৃষিপণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বাজারে দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে আপাতত টানা বৃষ্টি ও সরবরাহ সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম। ফলে প্রতিদিনের বাজার করতে গিয়ে সীমিত আয়ের মানুষের ব্যয় আরও বাড়ছে, যা তাদের সংসার পরিচালনায় নতুন চাপ তৈরি করছে।
ভিওডি বাংলা/জা









মন্তব্য