মহাকাশযানের ‘ক্লিনার’ থেকে মার্স অভিযানের লিডার

মাত্র ১৪ বছর বয়সে কাজের অংশ হিসেবে মহাকাশযানের একটি শৌচাগার (স্পেস টয়লেট) পরিষ্কার করতে হয়েছিল ক্লেয়ার পারফিটকে। পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে মহাকাশ নিয়ে পেশাজীবন গড়ার ক্ষেত্রে এটিই ছিল তাঁর প্রথম হাতেখড়ি। কে জানত, লেস্টারের ‘ন্যাশনাল স্পেস সায়েন্স সেন্টার’-এ কাটানো সেই সময়টি একদিন তাঁকে ভবিষ্যতের মঙ্গলগ্রহ (মার্স) অভিযানের একটি গবেষণা দলের নেতৃত্বে নিয়ে আসবে!
যুক্তরাজ্যের নটিংহামের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী ক্লেয়ার পারফিট। পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক এবং মহাকাশযানের পাওয়ার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি মহাকাশ শিল্পে যোগ দেন। তিনি এখন নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) ‘ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি কেন্দ্র’-এ কর্মরত।
ক্লেয়ার এরমধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে কাজ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘এক্সোমার্স রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন রোভার’ অভিযান, যা মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশ অনুসন্ধানে কাজ করবে। এছাড়া তিনি ‘স্মাইল’ (সোলার উইন্ড, ম্যাগনেটোস্ফেরিক, আয়নিক লিঙ্ক এক্সপ্লোরার) অভিযানেও যুক্ত ছিলেন। সূর্যের সৌরঝড়ের প্রতি পৃথিবী কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা চারটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
তবে ক্লেয়ার এখনো কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন কীভাবে তাঁর শৈশবের দিনগুলো, বিশেষ করে ওয়ালাটনের ফার্নউড স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকদের সহযোগিতা তাঁর ক্যারিয়ারের পথ সুগম করেছিল।
শুরুর দিকে তিনি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাতে কাজের অভিজ্ঞতার জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে সেটি মেলেনি। পরবর্তীতে তিনি ‘ন্যাশনাল স্পেস সায়েন্স সেন্টার’-এ যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
ক্লেয়ার যখন সেখানে কাজ শুরু করেন, তখন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রধান মহাকাশ বিজ্ঞান আকর্ষণ ‘ন্যাশনাল স্পেস সেন্টার’ উদ্বোধনের জন্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক নিদর্শন সংগ্রহ এবং তা সাজানোর পরিকল্পনা করছিলেন।
ক্লেয়ার বলেন, ‘আমি সবসময় জানতাম যে এটাই আমি করতে চেয়েছিলাম। সেই সময় ওই স্পেস সেন্টারের পরিচালক ছিলেন অ্যালেক্স হল নামের এক নারী। ওই পদে একজন নারীকে দায়িত্ব পালন করতে দেখাটা মহাকাশ শিল্পে আমার নিজের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের রূপরেখা কল্পনা করতে দারুণ সাহায্য করেছিল।’
২০০১ সালের জুনে স্পেস সেন্টারটি উদ্বোধনের আগের দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে ক্লেয়ার বলেন, ‘একের পর এক প্রদর্শনীর জিনিসপত্র অফিসে আসছিল। তার মধ্যে একটি ছিল মহাকাশযানের শৌচাগার, যা আমি আগে কখনো দেখিনি। সেটি বাক্স থেকে বের করতে আমি সাহায্য করেছিলাম। সেটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কিছু কাজ করতে হয়েছিল। মহাকাশ অভিযানে ব্যবহৃত এটি ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি প্রযুক্তি, যা নিজ চোখে দেখাটা ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর।’
মহাকাশে যাওয়া প্রথম ব্রিটিশ নাগরিক হেলেন শারম্যানের ব্যবহৃত স্পেস সুটটি (মহাকাশচারীর পোশাক) বাক্স থেকে বের করার কাজেও হাত লাগিয়েছিলেন ক্লেয়ার।
২৫ বছর আগে উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত ‘ন্যাশনাল স্পেস সেন্টার’ প্রায় ৬০ লাখ দর্শনার্থীকে স্বাগত জানিয়েছে। এই কেন্দ্রটিকে ‘অসাধারণ’ আখ্যা দিয়ে ক্লেয়ার বলেন, ‘মানুষের যাওয়ার জন্য এটি একটি ভীষণ অনুপ্রেরণাদায়ক জায়গা। আমি খুব অল্প বয়স থেকেই এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। আমি নিশ্চিত, এটিই আমাকে মহাকাশ নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার বর্তমান পথে নিয়ে এসেছে।’
যুক্তরাজ্যের মহাকাশ শিল্পে কিছুদিন কাজ করার পর ২০১৯ সালে ক্লেয়ার নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে যোগ দেন।
নিজের পেশাজীবনকে ‘স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো’ হিসেবে বর্ণনা করা ক্লেয়ার এখন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থায় ভবিষ্যতের মানব ও রোবোটিক মঙ্গল অভিযানের পরিকল্পনা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল মার্স এক্সপ্লোরেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এরও সভাপতি।
ক্লেয়ারের মতে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অনুসন্ধানের জন্য মঙ্গল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। তিনি বলেন, “২০২৮ সালে যখন ‘রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন’ মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হবে, সেটি হবে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর একটি মুহূর্ত। এরপর ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানগুলোর জন্য মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরির অনেক প্রস্তুতি বাকি রয়েছে। আমাদের আগামী দশকগুলোর পরিকল্পনা খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে, যাতে আমরা মঙ্গলের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে পারি এবং ইউরোপের জন্য সেরা বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আসতে পারি।”
ভিওডি বাংলা/এফএ







মন্তব্য