সরকার মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে চায়: মাহ্দী আমিন

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেছেন, আমরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাব নির্বাচনী ইশতেহারে সে সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আমরা একটি মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে চাই। যেখানে আমরা নতুন নতুন বিষয় চালু করব। উদাহরণস্বরূপ, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সকল ছাত্রছাত্রীর জন্য কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইউনেস্কো আয়োজিত ‘গ্লোবাল পার্টানারশিপ ফর অ্যাডুকেশন সিস্টেম ট্রান্সফরমেশন গ্র্যান্ট অ্যান্ড মাল্টিপিলার গ্র্যান্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একটি তৃতীয় ভাষা চালু করতে যাচ্ছি। সকল ছাত্রছাত্রীর জন্য এটি চালু হতে কিছুটা সময় লাগবে, তবে সেই প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে সকল ছাত্রছাত্রীর জন্য আরও দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছি। একটি হলো সংস্কৃতি এবং অন্যটি খেলাধুলা। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটি এমন একটি আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যাবে, যাকে আমরা বলি “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস”।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের শিখতে বাধ্য করা হবে না, বরং তারা একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশে কাজ করবে। যেখানে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে সর্বোত্তম সম্পর্ক থাকবে এবং তারা তাদের নিজস্ব প্রতিভা দিয়ে চেষ্টা করবে। সুতরাং, এগুলো আমাদের কিছু আদর্শ ও নীতি। আমরা যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাব, তখন এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে। এবং এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আমাদের সকল অংশীজনদের আরও সহযোগীতার প্রয়োজন।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন সরকারের জন্য ৪৮ মিলিয়ন বরাদ্দের ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সকলকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এই অর্থকে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারব, যা দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রয়োজনীয়তা ছিল।
মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, আজ আমরা যে অনুদানটি পাচ্ছি তা সরকারের অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। আমরা চাই আমাদের সকল উন্নয়ন অংশীদার ও অংশীজন সামঞ্জস্যতা বজায় থাকুক। যেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রণীত নীতি কাঠামো এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আগামী দিনগুলিতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের অনুদান এবং দক্ষতার সাথে সরাসরি সঙ্গতিপূর্ণ হবে। আমরা একদিকে যেমন এই প্রাপ্ত তহবিলকে স্বাগত জানাতে এসেছি, তেমনই অন্যদিকে সরকারের আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে তা প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতেও এসেছি। যাতে আমরা বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে এই নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।
সকল আন্তর্জাতিক অংশীজন এবং সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অংশীদারদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি একসাথে আমরা কিছু উল্লেখযোগ্য ও অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারব। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা আরও বেশি কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত করে গড়ে তুলতে চাই। এবং এটি এমন একটি ক্ষেত্র তৈরি করবে যেখানে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য হ্রাস পাবে, যার জন্য আমরা প্রযুক্তিগত বিষয়ের উপরও মনোযোগ দিচ্ছি।
উদাহরণস্বরূপ প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, “ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব” প্রোগ্রাম, 'মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম' এর মতো বিষয়গুলোকে আমরা অগ্রাধিকার দিতে চাই। সেজন্যই আমরা সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য একই ইউনিফর্ম, একই স্কুল ব্যাগ, একই জুতো চালু করছি এবং সেই সাথে "মিড ডে মিল" প্রকল্পও চালু করছি। এটি এখন জাতীয় পর্যায়ে রয়েছে এবং আমরা এ বিষয়ে কিছু মতামত পাচ্ছি; আমাদের কাজের পদ্ধতি নতুন করে সাজাতে হবে।
মাহ্দী আমিন আরও বলেন, পাঠদানের জন্য শিক্ষকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের বৃহত্তর পরিমণ্ডলের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। আর এই বৃহত্তর পরিমণ্ডল বলতে বোঝায় পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষণ পদ্ধতি, প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ, বৈষম্য হ্রাস করা এবং এই সবকিছুকে আমরা একটি ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে হিসেবে দেখি। সুতরাং, শিক্ষকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন, আমাদের শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাঁদেরকে আরো পরিশীলিত করে গড়ে তুলতে হবে এবং তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে বৈশ্বিক সেরা প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা বুঝি আমাদের বর্তমান এই বৃহৎ ব্যবস্থা এবং মাল্টিপ্লাই গ্রান্ট শিক্ষকদের সক্ষমতা উন্নয়নের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। যা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির সাথেও শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বাস করি, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে আমরা একসাথে কাজ করব এটা নিশ্চিত করতে যে, একদিকে এই অনুদান শিক্ষকদের সর্বোত্তম সক্ষমতা ব্যবহারে সহায়তা করবে। এবং অন্যদিকে সকল প্রধান অংশীজনের ক্রমবর্ধমান সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারের কর্মসূচিও এগিয়ে যাবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা দেখছি যে এখানে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের একটা গ্রান্ট কনফার্ম হয়েছে, যেখানে ইন্টারন্যাশনাল স্টেকহোল্ডাররা সবাই এক হয়ে পড়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে নির্বাচনী ইশতেহার রয়েছে , তার আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে আমরা আরো বেশি অন্তর্ভূক্তিমূলক করতে পারি, অংশীদারিত্ব পূর্ণ করতে পারি। যার মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্মের এবং যারা শিশু কিশোর রয়েছেন স্কুলে ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে টুয়েলভ পর্যন্ত প্রত্যেকের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারি, সুপ্ত প্রতিভাকে আরো কীভাবে আমরা জাগরিত করতে পারি, কীভাবে তাঁদের দক্ষতা এবং যোগ্যতা তৈরি হয় । যার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে তাঁরা বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে এবং তার জন্য আমরা কারিকুলামের ডেভেলপমেন্টের কাজ করছি। সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলোর উপর গুরুত্বারোপ করছ। ক্রীড়া এবং সংস্কৃতিকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোজন করছি।
প্রধানমন্ত্রী এ উপদেষ্টা বলেন, প্রতিটা কার্যক্রম তখনই আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব, যখন আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের যে কান্ডারী শিক্ষার্থীরা আর তাঁদেরকে যারা তৈরি করেন সেই শিক্ষক অর্থাৎ শিক্ষাবিদ তৈরি করা কারিগরদেরকে আমরা একসাথে দক্ষ, যোগ্য, সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনে যে ইশতেহার রয়েছে সেটাকে কিভাবে বাস্তবায়ন করতে পারব এবং সবাই এক হয়ে কীভাবে সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। যার মৌলিক ভিত্তি হবে শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারকে বাস্তবায়ন করার।আমরা বিশ্বাস করি যদি আমরা সবাই একযোগে কাজ করি তাহলে ইনআশাল্লাহ অবশ্যই আগামীর বাংলাদেশকে আমরা সেভাবে গড়ে তুলবো, যেভাবে প্রধানমন্ত্রী সবসময় চেয়েছেন। আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার করে একটি আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চাই। যেখানে আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে আমরা দেশপ্রেমিক, সুনাগরিক, যোগ্য এবং দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব এবং যেখানে তাঁদেরকে ধাবিত করবে। তাঁদেরকে তৈরি করবে আগামী সুশিক্ষিত এবং মেধাবী শিক্ষক।
অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউনেস্কো প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভিওডি বাংলা/এএইচ/এফএ








মন্তব্য