জাতিসংঘ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুই দায়িত্বেই খলিলুর রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ছেন না খলিলুর রহমান। যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করেন, একসঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে এবং তিনিও সেই পথেই এগোতে চান।
সাংবাদিকরা জানতে চান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ছুটিতে যাবেন কি না। জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, “চাকরি ছাড়ব কি না, এটাই তো? না না, ছুটি নেব কি না? ভাই, এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই! এর নজির আছে। আজ থেকে ৪০ বছর আগে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাহেব, আমাদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমি তার একান্ত সচিব ছিলাম এবং তার সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি দুই পদেই পূর্ণকালীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। তখন ছিল ইন্টারনেট-পূর্ব যুগ। কিন্তু এখন নিরবচ্ছিন্নভাবে দুটি দায়িত্বই একসঙ্গে পালন করা সম্ভব। এটা এখন খুবই স্বাভাবিক।”
এর আগে জাতিসংঘের এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলে এক বছরের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে ছুটি নেবেন। ওই বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তিনি একইসঙ্গে দুটি দায়িত্বই পালন করবেন।
দেশে ফেরার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও অংশ নেন খলিলুর রহমান। বৈঠকে তাকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানানো হয়।
বিধিগত বাধা দেখছেন না বিশ্লেষকরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে করতেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে কোনো বিধিগত জটিলতা নেই। অতীতেও বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এমন উদাহরণ দেখা গেছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘এমনকি চার দশক আগে বাংলাদেশ থেকে যিনি প্রথমবার সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী নিজেও এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে বহাল থেকেই জাতিসংঘের দায়িত্ব পালন করেছেন।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘যদি ডেডিকেটেডলি ওনার এই (জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির) কাজটি করতে হয়, তাহলে ওনাকে সময়টা দিতেই হবে ওখানে। বাট দ্যাট ডাস নট মিন যে, উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।’
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর।
কীভাবে চলবে দুই দায়িত্ব?
গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ভোটে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান। তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে আট ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
নির্বাচনের পর থেকেই তার মন্ত্রিত্ব বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুটি দায়িত্ব সমান্তরালভাবে পালনের পরিকল্পনাই এখন চূড়ান্ত।
ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘এটা অসম্ভব কিছু নয়, কারণ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বটি সার্বক্ষণিক কোনো দায়িত্ব নয়। মূলত সভাপতির দায়িত্বটা বর্তায় যখন সাধারণ পরিষদ অধিবেশন হয়।’
তার মতে, সাধারণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে সভাপতির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ফলে সেপ্টেম্বরে কয়েক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে অবস্থান করতে হবে খলিলুর রহমানকে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম অধিবেশন চলাকালে সভাপতিকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হয়। ফলে খলিলুর রহমানকেও সেসময় কয়েক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে অবস্থান করতে হবে।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রতিটি অধিবেশনের জন্য একাধিক সহ-সভাপতি নির্বাচিত থাকেন। সভাপতির অনুপস্থিতিতে তাদের মধ্য থেকে কেউ অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে ড. জাহান বলেন, ‘এটা অনেকটা আমাদের সংসদের মতো ব্যাপার। স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে ডেপুটি স্পিকার যেভাবে কাজ চালিয়ে নেন, ওইখানেও সেটা করা হয়।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের কাজে ব্যস্ত থাকলে মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও সহযোগিতা করবেন।
বেতন দেবে বাংলাদেশ সরকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একটি নির্দিষ্ট কার্যালয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা পাবেন খলিলুর রহমান।
ড. সেলিম জাহান বলেন, এটা জিএ বা সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের অফিস নামে পরিচিত। সেখানে কাজকর্ম পরিচালনার জন্য বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারি থাকবেন। উনার একজন একান্ত সচিবও থাকবেন।
দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন সফরে তিনি কূটনৈতিক প্রোটোকল ও নিরাপত্তা সুবিধা ভোগ করবেন। তবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মতো আলাদা বাসভবন তার জন্য থাকবে না। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কূটনৈতিক বাসভবন ব্যবহার করতে হবে।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোনো বেতন দেওয়া হয় না। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারই তার বেতন বহন করে।
ফলে খলিলুর রহমানও বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেই বেতন পাবেন।
বর্তমানে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী Annalena Baerbock। জার্মান পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি প্রতি মাসে প্রায় ১৩ হাজার ইউরো বেতন পান।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
ভিওডি বাংলা/এমএস







