মেলার মানুষ
জীবন এতো ছোট কেন

খান মুহাম্মদ রুমেল
ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ শনিবার মেলায় ঢুকতে দেরি হয়ে যায়। ভিড় ঠেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরে ঢুকতে ঢুকতে সন্ধ্যা ছয়টা। ঢুকে যথারীতি অনিন্দ্য প্রকাশের সামনে একটু দাঁড়াই। প্রচুর মানুষের ভিড়। বেচাকেনাও জমেছে বলে মনে হয়। মানুষের হাতে হাতে বইয়ের প্যাকেট। দেখে খুব ভালো লাগে। গতকাল বলেছিলাম— মেলায় শুধু মানুষ, পাঠক কই? আজকে মনে হয় পাঠকের দেখা মিলেছে। বইমেলায় মানুষের হাতে হাতে বই— এটি আমার কাছে পৃথিবীর মধুরতম দৃশ্য বলে মনেহয়। আরো একটু ঘুরে দেখার ইচ্ছে জাগে। হাঁটতে থাকি উদ্দেশ্যহীন। প্রায় সব স্টল প্যাভিলিয়নে দেখি মানুষের ভিড়। বাবা মায়ের সঙ্গে ছোট্ট শিশুরাও আছে। ঘুরে ঘুরে নিজের পছন্দ মতো বই কিনছে তারা। এইসব মনোহর দৃশ্য বড় আনন্দ দেয়।
হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয়ে যায় আর. করিমের সঙ্গে। ঢাকার এবং সারাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষজন খুব ভালো করেই চেনেন তাকে। সবার সঙ্গে খুব আন্তরিক সম্পর্ক তার। আর. করিম খুব প্রতিভাবান তরুণ। হাতের কাছে যা পান তাই দিয়ে ছবি আঁকতে পারেন তিনি। আঁকতে পারেন কথাটা না বলে বানাতে পারেন বললে বোধহয় সবচেয়ে ভালো হয়। উদাহরণ দিই— করিম হয়তো কলা খেলেন, তারপর সেই কলার ছিলকা দিয়ে বানিয়ে ফেলেন সুন্দর কোনো ছবি। চায়ের স্টলের টেবিলে পানি ফেলে তারপর আঙুল দিয়ে নেড়েচেড়ে বানিয়ে ফেলেন রবীন্দ্রনাথ। ঝরে পড়া গাছের পাতা দিয়ে বানিয়ে ফেলেন নজরুল। সবুজ বটবৃক্ষের পাতায় হাতের কারুকাজে আর. করিম ফুটিয়ে তোলেন জীবনানন্দ দাশ! কি যে বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে জন্মেছেন এই তরুণ— বলে বোঝানো যাবে না। এছাড়া খুব সুন্দর স্কেচ আঁকতে পারেন তিনি। সেই পেন্সিল স্কেচ দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। আর. করিমের সঙ্গে আমার পরিচয় ফেসবুকে। মাঝে মাঝে টুকটাক কথা হতো। একদিন হঠাৎ আমার অনিন্দ্য সুন্দর একটা স্কেচ এঁকে পাঠান আর. করিম। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি তার আঁকা ছবির দিকে। ধীরে ধীরে তার সঙ্গে সখ্য বাড়ে। মেলায় দেখা হয়েছে বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে। এক বছর পরে তার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে খুব ভালো লাগে।
— ভাই কেমন আছেন? আর. করিমের কথায় কক্সবাজারের মহেশখালির টান।
— ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
— আমিও ভালো আছি।
— কবে এলেন ঢাকায়?
— এই তো দুই তিন দিন হলো।
— থাকবেন কিছুদিন?
— আছি আরো কয়েকদিন।
— মেলা কেমন দেখছেন?
— ভালো লাগে না ভাই।
— কেন, কি হয়েছে?
— নাহ, এমনি ভালো লাগে না আর কি!
করিমের গলাটা খুব উদাস উদাস লাগে। হয়তো কিছু বোঝাতে চান তিনি। কিন্তু বলতে পারেন না। কিংবা কে জানে হয়তো বলতে চান না। আমি কথা ঘোরানোর চেষ্টা করি।
— এবার আমার দুটো বইয়ে আপনার এঁকে দেয়া স্কেচ ব্যবহার করেছি।
— ওমা তাই নাকি?
— জি তাই।
আমি অনিন্দ্য প্রকাশের স্টল থেকে তাকে বই দুটো এনে দেখাই। আর. করিম কি খুশি হয়েছেন? তার চোখের ভাষায় কিছু বোঝা যায় না। তবে তার সঙ্গে থাকা একজন ছেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আমাকে।
— ওর কথা মনে আছে ভাই? গত বছর আপনার সঙ্গে মেলায় দেখা হয়েছিলো!
— জি মনে আছে।
— আচ্ছা ভাই যাই।
আর. করিম হারিয়ে যান মেলার ভিড়ে। অথচ তার সঙ্গে আরো অনেকক্ষণ আড্ডা দেয়ার ইচ্ছা ছিলো আমার।
আবার হাঁটতে থাকি একা একা। ইত্যাদি প্রকাশের ভেতর থেকে আমার নাম ধরে কেউ ডাকে। তাকিয়ে দেখি সাংবাদিক লেখক জামশেদ নাজিম। প্যাভিলিয়নের ভেতরে যেতে ডাকে সে। মেলায় এবার এসেছে তার বই— মৃত্যু কখনো কখনো জরুরি হয়। ভেতরে ঢুকে মুখোমুখি বসি আমরা। নাজিমের সঙ্গ আরো একজন লেখক আছেন। আডডা জমে তার সঙ্গে।
— আমি প্রশ্ন করি মৃত্যু কখনো কখনো কেন জরুরি হয়?
আমার কথা শুনে নাজিম চারপাশ কাঁপিয়ে উচ্চস্বরে হাসে। প্যাভিলিয়নের বিক্রয়কর্মীরা এবং পাঠক দর্শনার্থীরা আমাদের দিকে অবাক চোখে তাকায়। একটু থমে বলতে শুরু কের নাজিম।
— মানুষের জীবন এক গভীর রহস্য। কে কোন মুখোশের আড়ালে কী লুকিয়ে রাখে বোঝা বড়ই কঠিন। দানবের মতো এক ব্যক্তি আপন দুই বোনকে বিয়ে করেছিলো— সমাজ যাকে ভয় পেতো, ঘৃণা করতো! কিন্তু তার মৃত্যু কোনো ছায়া ফেলতে পারেনি স্ত্রীদের হৃদয়ে। অদ্ভূতভাবে তার মৃত্যু যেন এক স্বাভাবিক ঘটনা। শোক নেই চোখে জল নেই— কেবল নির্বিকার এক নীরবতা। তাহলে কি এই মৃত্যু প্রকৃতিই সাজিয়ে দিলো, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অজনা সত্য? আমার বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে সেই অমীমাংসিত রহস্য।
— বাহ, বেশ সুন্দর বললে। তোমার বইয়ের সাফল্য কমনা করি।
— চলো একটু বাইরে দিকে হাঁটি।
— চলো।
আমি আর নাজিম বের হয়ে আসি ইত্যাদি প্রকাশন থেকে। হাঁটতে হাঁটতে নাজিম আমাকে নিয়ে আসে অনিন্দ্য প্রকাশের সামনে। আমাকে অবাক করে দিয়ে দুটি বই কেনে। ’হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যার দিকে’ এবং ’মৃত্তিকা শুষে নাও বেদনা’। এবারের মেলায় এখন পর্যন্ত আমার এই দুটি বই প্রকাশ হয়েছে।
— অটোগ্রাফ দাও! গাঢ় স্বরে বলে নাজিম।
আমি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি। মনে পড়ে অনেক বছর আগে আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ হয়েছিলো— প্রণয়ের কোনো গন্তব্য নেই। প্রথম ক্রেতা ছিলো জামশেদ নাজিম।
— চলো একটু বসি। নাজিম বলে।
— নাহ, আমার একটু কাজ আছে। বের হবো এখন।
— ঠিক আছে যাও। দেখা হবে আবার।
ব্যাগ কাঁধে হাঁটতে থাকি আমি। অবসর প্রকাশের সামনে এসে দেখা হয়ে যায় এক সাবেক সহকর্মীর সাথে। হাতে একগাদা বই।
— ভাইয়া কেমন আছেন? হাসি মুখে জিজ্ঞেস করে সে।
— ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
— আমিও ভালো আছি।
— অনেক বই কিনেছো দেখছি।
— এই তো অল্প কিছু কিনলাম।
তার বইয়ে প্যাকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে তারাশঙ্করের কবি। আর কি কি আছে বোঝা যায় না।
— আচ্ছা যাই। ভালো থেকো।
— আপনিও ভালো থাকবেন।
হেঁটে চলি গেটের দিকে। ভিড় অনেক বাড়ছে। দলে দলে মানুষ ঢুকছেন মেলার মাঠে। সবার মুখে আনন্দিত ভাব। গেটের কাছটাতে ধুলা উড়ছে ভীষণ। মনের মধ্যে ঘুরপাক থাকে তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসের নিতাইয়ে বহুল পরিচিত সংলাপ— জীবন এতো ছোট কেনে!
আসলেই এতো ছোট কেন মানুষের জীবন!
[নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। ভিওডি বাংলা সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, ভিওডি বাংলা কর্তৃপক্ষের নয়]
ভিওডি বাংলা/এম







