• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

মেলার মানুষ

মেলায় শুধু মানুষ পাঠক কই?

   ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ০৬:৪৭ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

এবারের বইমেলার প্রথম শুক্রবার। তিল ফেলার জায়গা নেই কোথাও। পুরো শাহবাগ এলাকা মানুষে ঠাসা। টিসএসসি জুড়ে বহু মানুষের ভিড়। ঠেলেঠুলে কোনো মতে বইমেলায় ঢুকি যখন— সন্ধ্যা মিলিয়েছে কেবল। চারদিকে থইথই মানুষ। মানুষের চলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছে ধুলা। তবুও বড় ভালো লাগে এতো মানুষের ভিড়। বই নিয়ে মানুষের গভীর উৎসাহ অবশ্যই আশা জাগানিয়া। কিন্তু মেলার মাঠে একটু ঘুরতেই ভুল ভাঙে। আশার জায়গা দখল করতে চায় নিরাশা। এতো এতো মানুষ এলেও বই কিনছেন খুব কম মানুষ। প্রায় কারো হাতেই বই নেই। স্টল প্যাভিলিয়নে উপচে পড়া ভিড় নেই। মানুষ তাহলে করছেন কি? মানুষের ভিড় দেখি সব বিস্বাদ করপোরেট কফির দোকান ঘিরে। মানুষের ভিড় দেখি ভ্রাম্যমাণ আচার চানাচুরওয়ালাকে ঘিরে! গেলো কয়েক বছরে মেলার ভেতরে ভ্রাম্যমাণ আচার চানাচুর ঝালমুড়িওয়ালা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এবার তাহলে ব্যতিক্রম। একটা সময় বইমেলা যখন শুধুই বাংলা একাডেমি চত্বরে হতো— বারোয়ারি মেলায় পরিণত হয়েছিলো। টিএসসি পেরিয়ে মেলায় ঢোকার পথে রাস্তার দুপাশে হাঁড়িকুড়ি বাসন গ্লাস থেকে শুরু করে নানান তৈজসপত্র নিয়ে বসতো মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে ক্যাসেট বিক্রিও চলতো তখন। সেসব পেছন ফেলে এসেছে বাংলা একাডেমি অনেক আগেই। গেলো বেশকিছু বছর ধরেই মেলায় বই ছাড়া অন্য কিছু নেই। যদিও নিরাপত্তা বাহিনীর স্টলসহ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে— সেটা অবশ্য ভিন্ন আলোচনা। কারণ তাদের থাকার প্রয়োজন অবশ্যই আছে।

দুপুর থেকেই মেলায় আসার জন্য ফোন দিচ্ছিলো লেখক চিন্তক কামরুল আহসান। পড়াশোনা এবং চিন্তার গভীরতায় এই সময়ের এক অগ্রগামী তরুণ কামরুল আহসান আমার বন্ধু মানুষ। দুই দশকের কিছু কম সময় আগে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। বছর দুয়েক আমরা এক সঙ্গে কাজ করেছিলাম একটা পত্রিকায়। তবে সেই থেকে কামরুলের সঙ্গে শুরু হওয়া বন্ধুত্বতা আজও আছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে অনেক কিছুই। বদলে গেছে শহর। বদলে গেছি আমরাও। শুধু কামরুল আর আমার বন্ধুত্বটা বদলায়নি। এখনো আটকে আছে দু্ই দশক আগের আমাদের কিশোর পেরোনো সদ্য যৌবনবেলায়। মেলায় ঢুকে কামরুলকে ফোন করি।
—    দোস্ত কোথায়? আমি মেলায় ঢুকেছি।
—    কালী মন্দিরের পাশে আছি।
—    মুক্তমঞ্চের সামনে আয়। দেরি করিস না।
—    দেরি হবে না, আসতে যতোক্ষণ লাগে।

অল্প সময়ের মধ্যে হেলতে দুলতে এসে হাজির হয় কামরুল আহসান। হাতে দু’তিনটা বইয়ের প্যাকেট। পরনে হালকা ঘি রংয়ের জ্যাকেট। গলায় পেঁচানো মাফলার! 
—    এই গরমের মধ্যে কি পরেছিস এসব?
—    দোস্ত আমার খুব শীত লাগে। তাছাড়া মাফলার না পেঁচালে এই সময়ে গলা বসে যায় আমার।
—    ভালো! কেমন দেখছিস মেলা?
—    শুধু তো মানুষ দেখি। পাঠক কই?
—    তাই তো দেখছি।

মেলার অবস্থা দেখে খুব হতাশ লাগে কামরুলকে।
—    একটা জাতি এতোটা বই বিমুখ কেমন করে হয়? বলতো!
—    শোন আমাদের ইতিহাস হলো চাষের ইতিহাস। আমরা হাইল্যার জাতি। আমাদের পড়াশোনার ইতিহাস এক পুরুষ কি দেড় পুরুষের। সেটাও কেরানি বানানোর পড়াশোনা। এরপর থেকে আমরা কেবল সার্টফিকেট কিনেছি।

গাইড বই মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে ক্লাসের পর ক্লাস উতরে গেছি। পড়াশোনার সময় কোথায় আমাদের! পড়ার অভ্যাসটাই তো গড়ে উঠেনি। আমাদের বাবা মা ক্লাসের বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়াকে নেতিবাচক চোখে দেখেন। সুতরাং আমাদের বইমেলায় পাঠক আসবে কোত্থেকে? এখানে তাই শুধু মানুষ আর মানুষ!
আমার কথা শুনে নীরবে মাথা নাড়ে কামরুল।
—    ধুর আমার কিছু ভালো লাগে না। এই জাতির সামনে ভালো কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।
—    এতো হতাশ হোস না। এসবের মধ্য থেকেই ভালো কিছু বের হয়ে আসবে একদিন।
—    না হতাশ হই না। তুই যদি এই বাংলার অন্তত গত দেড় হাজার বছরের ইতিহাস পড়িস তাহলে বর্তমান সময় নিয়ে হতাশ হতে পারবি না, কারণ সহস্র বছর ধরেই এই জনপদ অভিশপ্ত। যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলের মানুষকে শাস্তি ভোগ করতে হবে এটা একটা ভৌগোলিক নিয়তি। কেন এই নিয়তির বেড়াজালে এই বাংলার মানুষকে আবদ্ধ হতে হলো সেটাই হচ্ছে অনুসন্ধানের বিষয়। এর কারণ কি জল-হাওয়া-মাটি? না কি খাদ্যাভ্যাস? ভাত-ডাল- মাছের কারণে? কেন এই জাতির মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ হলো না! কেন আমাদের আবেগ এত বেশি আর লজিক এত কম? এর কারণগুলো নৃতাত্ত্বিকভাবেই অনুসন্ধান জরুরি। তা না হলে তো এ জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহপাক সূরা আম্বিয়ার ১১ তম আয়াতে এরশাদ করছেন, "আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি, যার অধিবাসীরা ছিল সীমা লংঘনকারী।" কার্ল মার্কস  বলেছিলেন, ধ্বংসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন বহু জনগোষ্ঠী দেখা গেছে যারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে।  আমরাও কি সেই দিকে ধাবিত হচ্ছি? কথাগুলো সাম্প্রতিক কোনো প্রেক্ষাপট নিয়ে বলছি না। আমাদের সামগ্রিক অবস্থাদৃষ্টেই মনে হয় আমাদের কোথায় যেন একটা সমস্যা আছে।  অন্তত ঐতিহাসিকভাবে তা সত্য। এ অঞ্চলে তা না হলে এত মুসলমানের আগমন হবে কেন বল? অনেক হিন্দু ঐতিহাসিক বলেন, মুসলমানরা আসার পর থেকেই নাকি এ জাতির দুর্ভাগ্য শুরু। কিন্তু সত্য হচ্ছে, যদি আগে থেকেই দুর্ভাগ্য না থাকতো তাহলে এ অঞ্চলে এত মুসলমানের আবির্ভাব হতো না। মুসলমান তখন কেউ শখে হয় নাই, ঈমানের বলিয়ানে হয় নাই, হয়েছে ঠেকায় পড়ে। এই বাংলার মাটি মুসলমানদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কারণ মুসলমান না হতে পারলে তাদের মানুষ হিসেবেও কোনো পরিচয় গড়ে উঠছিল না। মুষ্টিমেয় মানুষ মুসলমান হলো বটে, কিন্তু তাদের যে ঐতিহাসিক দুর্ভাগ্য সেটা কিন্তু এড়াতে পারল না। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ নির্বিশেষে এই  অঞ্চলের সবাইকেই সেই দুর্ভাগ্য পোহাতে হয়েছে।  তারপর দেখ মুঘল এলো, ইংরেজ এলো, পাকিস্তান এলো, এই বাংলার মুসলমানের (সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীরই) কিন্তু ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় নাই। এবং দেশভাগের পরও সেই দুর্ভোগ বহন করতে হয়েছে, স্বাধীনতার পরও, আজও.. দুর্ভাগ্যের ইতিহাস চলমান.!
বেশ লম্বা একটা বক্তৃতা দেয় কামরুল। তার কথার সঙ্গে এক হই। শুধু কিছু কথা যোগ করি। 
—    এই যে আমাদের একটা প্রজন্ম বলতে গেলে পাঠ বিমুখ হয়ে গেলো এর দায় কার?
—    কেউ এককভাবে দায়ী না। এটা আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।
—    কিন্তু সেটাও তো আমরা স্বীকার করি না।
—    মূর্খ বলেই তো আমাদের এই অস্বীকার প্রবণতা।
ফোন বাজে আমার। পরিচত একজন জানতে চাইছেন মেলার মাঠে আছি কি না। কথা শেষ করে আবার কামরুলের দিকে তাকাই।
—    চা খাবি দোস্ত? জিজ্ঞেস করে কামরুল!
—    এই মেলার মাঠে চা পাবি কোথায়? শুধুই তো কফির দোকান।
—    চল তোর একটা বই কিনি।
কামরুল এগিয়ে যায়। এক কপি গল্পবই কেনে আমার— হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যার দিকে। এরপর মেলার ভিড়ের মধ্যে আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় কামরুল আহসান। আমাদের অগ্রজ লেখক মনি হায়দার ভাই যাকে ভালোবেসে ডাকেন বাংলাদেশের সক্রেটিস।

ভিওডি বাংলা/এম 


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়