মেলার মানুষ
এক সন্ধ্যায় কার সাথে

খান মুহাম্মদ রুমেল
বনশ্রী থেকে রাইড শেয়ারের বাইকে রওয়ানা দিয়ে ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনে এসে আটকে যেতে হয়। এখান থেকে রাস্তা বন্ধ। বাইক ছেড়ে হাঁটতে থাকি। শাহবাগ মোড়ে এসে দেখি এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন জুলাই আগস্ট আন্দোলনে হতাহতদের স্বজনরা। তারা আহতদের সুচিকিৎসা এবং শহিদ পরিবারের বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় আছে অনেক। চারদিক থেকেই যানবাহন চলাচল বন্ধ। মোড় পেরিয়ে ফুলের দোকানগুলোর সামনে থেকে রিকশা নেবো, ভাবি। কিন্তু মুহুর্তে মত পাল্টে যায়। হেঁটেই মেলায় যাবো ঠিক করি। রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা। পঞ্জিকার পাতায় এখনো শীতকাল। কিন্তু বাতাসে বসন্তের হাওয়া। বাসন্তী বাতাসে ঝরে পড়ছে শুকনো পাতা। একটু পর পর টুং টুং ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যাচ্ছে রিকশা। যান্ত্রিক যান নেই কোনো। হাঁটতে ভালো লাগে খুব। চারুকলার বরাবর উল্টো দিকে ছবির হাটের একটু আগে দেখি ফুটপাতে প্লাস্টিকের পর্দা বিছিয়ে বই নিয়ে বসেছেন একজন। তাকে ঘিরে গুটিকয়েক মানুষের ভিড়! বেশির ভাগই বিদেশি লেখকের পাইরেটেড বই! একবার ইচ্ছে হলো দাঁড়াই। কিন্তু এমনি আজকে আসতে দেরি হয়ে গেছে। ফলে আর সময় নষ্ট করি না।
বৃহস্পতিবার সাধারণত মেলায় ভিড় থাকে খুব। কিন্তু এদিন আশপাশের এলাকায় যানবাহন বন্ধ বলেই হয়তো মানুষের উপস্থিতি কম। গেট দিয়ে ঢোকার সময় বোঝা যায় মেলায় বেশি মানুষ আসতে পারেননি এদিন। ভেতরে গিয়ে কি করবো, ভাবছি! প্রথম দিন থেকেই আমার দুইটা নতুন বই আছে অনিন্দ্য প্রকাশের স্টলে। একটা গল্পবই হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যার দিকে আরেকটা কবিতাবই মৃত্তিকা শুষে নাও বেদনা। স্টলের ছেলেগুলো কিছু বলে না। কিন্তু জোবায়েরের বিষন্ন মুখ দেখে বুঝতে পারি বিক্রি হচ্ছে না মোটেও। তবুও অভ্যাসবশে স্টলের সামনে একটুখানি দাঁড়াই। ভেতর থেকে জোবায়ের ডাকে।
- ভাই ভিতরে আইসা বসেন।
- না রে বসবো না!
- একটু চা দেই?
- লাগবে না। হাসি মুখে বলি।
কিছুদিন ধরে ভাবছি মুরসালীনের সঙ্গে দেখা করবো। মুরসালীন আল হামরা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী। নিজেও লেখক। সমাজ সচেতন মানুষ। সমসাময়িক নানা বিষয় এবং অসঙ্গতি নিয়ে নিয়মিত লেখে কথা বলে। পড়াশোনা প্রচুর। তার সঙ্গ বরাবরই ভালো লাগে। ফোন দিই তাকে।
- হ্যালো আপনি কোথায়?
- অনন্যার সামনে আছি।
- আমি মুক্ত মঞ্চের সামনে। একটু আসবেন? অনেক দিন কথা হয় না আপনার সাথে।
- ভাই আমি আসতেসি এখনই।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে আসেন মুরসালিন।
- ভাই কেমন আছেন? হাসি ঝরে দাড়ি গোঁফে ঢাকা মুরসালিনের চোখ মুখ থেকে।
- আছি মোটামুটি। আপনি কেমন আছেন?
- এই তো ভাইজান আছি নানান পেরেশানিতে। বোঝেন তো মেলার সময়, এখন দম ফেলার সময় নেই।
- কি কি বই করছেন এবার?
- করেছি কয়েকটা । এরমধ্যে দাদাজানের রচনা সমগ্র করার ইচ্ছা আছে। দাদাজানের কবিতার বইটাও নতুন করে করবো। নজরুলকে নিয়ে ওনার কাজটাও ধরবো ভাবছি।
- ওহ ভালো তো। অনেক কাজ করছেন তাহলে!
- এই আর কি। চেষ্টা করছি। হাসেন মুরসালীন।
এখানে একটু বলি - তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব ছাড়িয়ে খ্যাত কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের নাতি মুরসালীন!
- মেলা কেমন দেখছেন? প্রশ্ন করি।
- মিশ্র। ভালো মন্দ দুটোই আছে।
- আরেকটু বিস্তারিত বলেন ।
- এই ধরেন ভাই একটা বিশেষ থিম নিয়ে হতে পারতো মেলাটা। জুলাই আন্দোলনকে আরেকটু হাইলাইট হতে পারতো।
- মেলার থিমে জুলাই আন্দোলন আছে তো এবার! এছাড়া জুলাই চত্বরও আছে মেলায়।
- সেটা আছে। তবে আরেকটু গোছানো হতে পারতো। জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মেলায় সব কিছুতে লাল রংটাকে রাখা যেতো।
-- বুঝতে পেরেছি।
- ভাই বাংলাবাজার একদিনও এলেন না তো! কতদিন ধরে বলছি আসেন একদিন। দুই ভাই প্রাণখুলে আড্ডা দেই।
- আসবো একদিন। অবশ্যই আসবো। হাসি মুখে বলি।
- আর ভাই কথা ছিলো আপনার একটা বই করবো। সেটাও দিলেন না।
- আগামী বছর আপনাকে একটা বই দিবো। কথা দিলাম। পাক্কা।
- আচ্ছা ভাই পাক্কা। ভাইজান অনূমতি দিলে এবার একটু যাই?
- জি নিশ্চয়!
- বাংলাবাজার যাবো ভাই। প্রেসে অনেক কাজ।
- জি জি আপনি আগান।
- আরেক দিন অনেক সময় নিয়ে আড্ডা দিবো। কথা থাকলো।
- ঠিক আছে।
হাসি মুখে বিদায় নেয় মুরসালীন। আমিও হাঁটতে থাকি মেলার মাঠজুড়ে। হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে গেলো বছর মেলার মাঠের একটা কথা। সন্ধ্যার পর পর আড্ডা দিচ্ছি কালী মন্দিরে গেটের কাছের চায়ের দোকানে, লেখক গণমাধ্যমকর্মীরা মিলে। হঠাৎ পাশের দোকান থেকে একজন আমাকে ডেকে বলেন - আচ্ছা আপনি কি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের কেউ হোন? আমি হাসিমুখে বলি - না ভাই!
- না, নামের সঙ্গে মিল তো চাই জিজ্ঞেস করলাম!
- না না ঠিক আছে। আল হামরা প্রকাশনীর খান মুহাম্মদ মুরসালীন মুঈনুদ্দিন সাহেবের নাতি। সে আমার বন্ধু মানুষ।
- ওহ আচ্ছা।
এখন মুরসালীন চলে যাওয়ার পর মনে হয় গল্পটা তাকে বলতে পারলে ভালো লাগতো।
[নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। ভিওডি বাংলা সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, ভিওডি বাংলা কর্তৃপক্ষের নয়]
ভিওডি বাংলা/এম







