• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

বিএনপির কাউন্সিল: ঢাকা উত্তর-দক্ষিণে আলোচনায় যারা

আহসান হাবিব    ৫ মে ২০২৬, ০৬:৫৭ এ.এম.
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সংগঠন পুনর্গঠনের জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিট ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে হাইকমান্ড—যা ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।

তবে কারা প্রাধান্য পাবেন এসব কমিটিতে? কীভাবে বাছাই করা হবে নতুন নেতৃত্ব? ত্যাগীরা কি মূল্য পাচ্ছেন? নতুন-পুরোনোর সমন্বয় নাকি ভিন্ন কোনো পথ? এমন হাজারো প্রশ্ন কৌতূহলী নেতাকর্মীদের মনে। এ নিয়ে তাদের আগ্রহের শেষ নেই।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, যেকোনো কমিটির মেয়াদ শেষ হলে নতুন কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রস্তুতি চলছে। যারা ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলন এবং ৫ আগস্ট আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।

যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তর) সাইদুর রহমান মিন্টুও বললেন—ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করেছে এবং বর্তমান কমিটির নেতাদের মধ্যে যারা দলকে ভালোবাসেন, কর্মীদের ভালোবাসেন বা কর্মীবান্ধব, তাদের হাতে নেতৃত্ব দিলে ভালো হবে। আর একটি বিষয় হলো—সৎ নেতৃত্ব বেছে নিতে হবে—তাহলে দলের জন্য ভালো হবে, জনগণের জন্য ভালো হবে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নেতাদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে তুলনামূলক তরুণ, সক্রিয় নেতাদের। একই সঙ্গে ঘটানো হতে পারে নতুন-পুরোনোর সমন্বয়—যাতে সংগঠন গতিশীল থাকে।

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত করার কৌশল হিসেবে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন সক্রিয় করা, নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করারও কাজ শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ঢাকার দুই ইউনিটের সাংগঠনিক পুনর্গঠনে জোর দিয়েছে দলটি।

নতুন কমিটি গঠন কেন্দ্র করে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ‘নীরব তৎপরতা’। ভেতরে ভেতরে চলছে বিস্তর যোগাযোগ। নিজ অবস্থান শক্ত করতে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বাড়ানো এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করছেন আগ্রহীরা।

সমর্থন জোগাড়, ত্যাগ, দুর্দিনে রাজপথে সক্রিয় থাকার বিষয়গুলো শীর্ষ নেতাদের—বিশেষ করে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টিতে আনতে চালাচ্ছেন নানামুখী তৎপরতা।

পদপ্রত্যাশীরা নিজ গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরতে অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে রাখা ভূমিকাসহ, সংগঠনের প্রতি দীর্ঘদিনের অবদানের প্রচারণা চালাচ্ছেন সূক্ষ্ম কৌশলে।

এ বিষয়ে ভিওডি বাংলা কিছুদিন ধরে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর বিএনপির অন্তত ১০০ জন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, দক্ষিণে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, আ ন ম সাইফুল ইসলাম, সাইদুর রহমান মিন্টু, লিটন মাহমুদ, যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, গোলাম মাওলা শাহীন ও খন্দকার এনামুল হক এনাম, জাতীয়তাবাদী প্রচার দলের সভাপতি জাসাসের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজ কবির মুক্তা।

আর উত্তর বিএনপিতে আলোচনায় আছেন বর্তমান আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্য সচিব মোস্তফা জামান, পাশাপাশি এস এম জাহাঙ্গীর, মামুন হাসান, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন এবং সাবেক কমিশনার আনারুজ্জামান আনোয়ার।

তৎপরতা থাকলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাশিত পদের বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলছেন না। দলীয় শৃঙ্খলা ও হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তারা আপাতত ‘নীরব কৌশলই’ বেছে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী প্রচার দলের সভাপতি জাসাসের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজ কবির মুক্তা বলেন, দলীয় পদ ব্যক্তিগতভাবে চাওয়া-পাওয়ার বিষয় নয়—বরং এটি দলের প্রয়োজন ও সাংগঠনিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।

অন্যদিকে, গুরুত্বপূর্ণ এ দুই ইউনিটের সম্ভাব্য পুনর্গঠন ঘিরে নেতৃত্ব নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে ভিন্ন অবস্থান অনেকটা স্পষ্ট। একাংশের মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামে যেসব নেতা মাঠে সক্রিয় ছিলেন না বা নেতাকর্মীদের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়াননি, তাদের পুনরায় আনা হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মাঠপর্যায়ের ত্যাগী কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ার পাশাপাশি সংগঠন গতি হারাতে পারে। এছাড়া, অনুপ্রবেশকারী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তারা বলছেন, নেতৃত্ব এমন নেতাদের হাতে যাওয়া উচিত, যারা সংগঠনের জন্য সময় দিতে পারবেন, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন এবং দলীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হবেন। তাদের দৃষ্টিতে, দল ও সরকারের দায়িত্ব আলাদা করে দেখতে যারা সক্ষম, এমন সংগঠকধর্মী নেতৃত্বই বেশি কার্যকর।

তাদের মতে, এমপি বা মন্ত্রী হলে মূল দায়িত্ব হয়ে যায় রাষ্ট্র পরিচালনা, সরকারের নীতি বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কাজে সফলতা আনা। ফলে সংগঠনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সাংগঠনিক তদারকি বাধাগ্রস্ত হয়, যা গতিশীলতায় বিঘ্ন ঘটায়। এছাড়া কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ব্যস্ততা বাড়লে তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান বাধার মুখে পড়ে এবং তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ক্ষমতার ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই ব্যক্তি সরকার ও দলীয় নেতৃত্বে থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে এককেন্দ্রিকতার প্রবণতা তৈরি হতে পারে—যা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নেতৃত্ব বিকাশকে দুর্বল করতে পারে। পাশাপাশি দলীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একসঙ্গে পালনের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকিও থাকে। অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে—কারণ তারা মনে করেন, শীর্ষ নেতৃত্ব সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত না থাকায় তাদের ভূমিকা ও অবদান যথাযথ মূল্যায়ন হয় না।

অপর অংশের মতে, যারা ইতোমধ্যে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তারা দলীয় মনোনয়ন ও জনগণের ভোটের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। তারা বলছেন, এটি শুধু নির্বাচনী নয়—বরং নেতৃত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

তাদের যুক্তি—অভিজ্ঞ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নেতৃত্বে আনা হলে সরকারের সঙ্গে দলের সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম তৃণমূল পর্যায়ে সুষমভাবে পৌঁছাবে। সংগঠন আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয়তাও বাড়বে।

বাড্ডা থানা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বাবু বলেন, কঠিন সময়ে কারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভালোভাবেই জানেন। তার মতে, আসন্ন নির্বাচনে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন জরুরি।

অন্যদিকে দক্ষিণখান থানা বিএনপির আহ্বায়ক হেলাল তালুকদার বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞ নেতৃত্বই সংগঠন এগিয়ে নিতে পারে এবং তাদের হাতেই সাফল্য সম্ভব।

তবে দলের সিনিয়র জ্যেষ্ঠ মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ঢাকা উত্তর ছাত্রদলের যুগ্ন সম্পাদক হলেন নাগেশ্বরীর হাফিজুর
ঢাকা উত্তর ছাত্রদলের যুগ্ন সম্পাদক হলেন নাগেশ্বরীর হাফিজুর
তদবিরবাজদের ভীড়ে ত্যাগীরা যেন তীর্থের কাক
তদবিরবাজদের ভীড়ে ত্যাগীরা যেন তীর্থের কাক
ছাত্রদলের কমিটিতে নতুনত্ব, যুক্ত হলেন মোশন ডিজাইনার
ছাত্রদলের কমিটিতে নতুনত্ব, যুক্ত হলেন মোশন ডিজাইনার