মেলার মানুষ
স্বকৃত সন্ধ্যা ও অন্যান্যজন

খান মুহাম্মদ রুমেল
পঞ্চম দিনের বইমেলা সাধারণত এমনই থাকার কথা। সপ্তাহের মাঝের কর্মদিবস। সুতরাং ভিড় নেই তেমন। আরামদায়ক শৈথিল্য সবদিকে। উচ্ছ্বলতায় ভরা উপস্থিতি। তরুণ তরুনীর দল হাঁটছে হাসছে আড্ডা দিচ্ছে। সবার মাঝে আনন্দিত ভাব। দাঁড়িয়ে আছি মুক্তমঞ্চের সামনে, একা। বরাবর চোখের সামনে অনিন্দ্য প্রকাশের স্টল একেবারেই ফাঁকা। ভিড় নেই অ্যাডর্নে, একটু দূরের ভাষাচিত্র, আগামী প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নেও। আশপাশের সব প্রকাশনীরই একই অবস্থা। কথা বলার জন্য কাউকে পাই না। মুক্তমঞ্চের সামনের নিচু রেলিংটাতে কয়েকজন ছিন্নমূল শিশুকে বসে থাকতে দেখি। নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে তারা। ইচ্ছে জাগে তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করি। গল্প করার আড্ডা দেয়ার মানুষের বড় অভাব এখন। হঠাৎ হাজির হোন দুজন অনুজ গণমাধ্যকর্মী— আহমেদ আবদুল্লাহ শাবীব আর শ্রাবনী কবির অ্যামি। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখি ডানদিকের পাঠক সমাবেশের প্যাভিলিয়ন থেকে কানে ফোন নিয়ে বের হয়ে আসছেন লেখক স্বকৃত নোমান। মেলার দ্বিতীয় কি তৃতীয় দিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো এক ঝলক। একগাদা বই হাতে ব্যস্ত পায়ে যাচ্ছিলেন কোথাও। জিজ্ঞেস করতেই বলেছিলেন— ভাই একটু উত্তরা যাচ্ছি, একটা কাজে। সেদিন আর কথা হয়নি। তবে তার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে ছিলো খুব। আজকে তাকে দেখে তাই এগিয়ে যাই। তিনি ফোনে কথা বলেন, আমি দাঁড়িয়ে থাকি। আমার তাকিয়ে হাসেন নোমান। আমি ইশারা দিই— কথা শেষ করেন! ফোন শেষে এগিয়ে স্বকৃত নোমান। মুখের কালো মাস্ক সরিয়ে উচ্ছ্বল হাসেন।
— কেমন আছেন রুমেল ভাই?
— ভালো আছি। আর অপেক্ষায় আছি আপনার সঙ্গে কথা বলার।
— কি যে বলেন ভাই! কেমন চলছে আপনার নতুন চাকরি?
— এই তো চলছে কোনো রকম! আমাদের পত্রিকার জন্য একটা সাক্ষাৎকার দিন। তারপর আপনার সঙ্গে অনেক গল্প জমা আছে।
— নিশ্চয় নিশ্চয়।
ক্যামেরা হাতে মাইক্রোফোন হাতে এগিয়ে আসেন শাবীব আর শ্রাবনী।
— ঠিক আছে আপনি কথা বলেন। আমি আসছি একটু পরে।
স্বকৃত নোমানকে রেখে এগিয়ে যাই সামনের দিকে। ইতিউতি হাঁটি এদিক সেদিক।ফোন দেন কবি আপন অপু।
— ভাই আপনি কি মেলায় আছেন।
— আছি তো!
— কোথায় আছেন? আমি ঢুকেছি মেলায়।
— মুক্তমঞ্চের সামনে এসে দাঁড়া। আসছি আমি।
অপুকে ধরার জন্য আবার এসে মুক্তমঞ্চের সামনে দাঁড়াই। স্বকৃত নোমানের ইন্টারভিউ তখনো চলছে। অপুও আসেনি। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নোমানের কথা বলা দেখি। কি বলেন তিনি দূর থেকে শোনা যায় না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে নোমানের কথা বলা এবং আপন অপুর চলে আসা— দুটোই একসঙ্গে ঘটে।
— ভাই কেমন আছেন? অপুর মুখে সেই চিরচেনা মুচকি হাসি।
— ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
— আছি ভাই ভালোই। চলে যাবো এখনই। অফিসে কাজ আছে।
— তাহলে এলি কেন?
— শুধু আপনাকে দেখার জন্য এসেছি ভাই।
— এবার লিখেছিস কিছু?
— নাহ ভাই, দুই তিনটা পাণ্ডুলিপির কোনোটা অর্ধেক কোনোটা সিকিভাগ লেখা আছে। শেষ করতে পারি নাই একটাও।
— মেলা কেমন দেখছিস?
— ভালো লাগে না ভাই। মনে হয় কি যেন নাই!
আমাদের দুজনের সঙ্গে এই পর্যায়ে হাসিমুখে যোগ দেন স্বকৃত নোমান। বিদায় নেয় অপু।
অন্য প্রকাশ থেকে বের হয়েছে স্বকৃত নোমানের বই আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডলিপি। বইটি নিয়ে এরই মধ্যে প্রচুর আলোচনা। স্বকৃত নোমানও এনিয়ে ফেসবুকে লিখছেন বিস্তর। ২৪ জানুয়ারি ২০২৫— এ স্বকৃত নিজের ফেসবুক পাতায় লিখেছেন—
আপনারা মীর আসরার জামানের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রখ্যাত লেখক। সুরম্যনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আচার্য তার উপাধি। তার ছিল এক আশ্চর্য সম্মোহনী ক্ষমতা। নিজের প্রতি যে কাউকে আকৃষ্ট করতে পারতেন সহজেই। সামনে এলে পরম শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াত তার ছাত্রছাত্রী ও ভক্ত-শিষ্যরা। তিনি যখন হাঁটতেন, পেছনে হাঁটত তারা। যখন কথা বলতেন, তন্ময় হয়ে শুনত তারা। যেন বর্তমানের কোনো মানুষ নন, কথা বলছেন প্রাচীন ভারতের কোনো ঋষি। এবং নারীরা তার ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ে যেত সহজেই।
অথচ স্ত্রী রাফিদা জাহানের কাছে তিনি ছিলেন এক নিকৃষ্ট চরিত্রের মানুষ। সোফিয়া যেমন উৎপীড়ন করতেন তলস্তয়কে, তেমনি মীর আসরার জামানকে করতেন রাফিদা। কিন্তু আচার্যের ছিল বিস্ময়কর সহ্যক্ষমতা। স্ত্রীর উৎপীড়ন তিনি হাসিমুখে এড়িয়ে যেতেন। একদিন, তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের সুরে মগ্ন, কম্পিউটারে যখন বাজছিল, ‘এই তো তোমার প্রেম ওগো হৃদয়হরণ...’, তখন রাফিদার উৎপীড়নে তিনি আক্রান্ত হন হার্ট অ্যাটাকে। সেই অ্যাটাক সামলে উঠতে না পেরে প্রয়াত হন অকালে।
অনন্ত আতিক ছিল আচার্যের একান্ত সচিব। আচার্যের প্রয়াণের পর আতিকের বিরুদ্ধে রাফিদা তোলেন আচার্যের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি এবং বিস্তর লেখা চুরির গুরুতর অভিযোগ। সেই অভিযোগ নির্বিচারে বিশ্বাস করে অনন্তের নিন্দা করতে থাকে সবাই। চুরি করার মতো অপ্রকাশিত কোনো পাণ্ডুলিপি কি রেখে গিয়েছিলেন আচার্য? নাকি এই অভিযোগ অনন্তের প্রতি রাফিদা জাহানের কোনো অসূয়ার বহিঃপ্রকাশ?
আচার্য মীর আসরার জামানের জীবন, জীবনবোধ ও শিল্পচেতনা, জীবনের আনন্দ ও বিষাদ, প্রেম ও অপ্রেম, শোক ও বিলাপ, দাম্পত্য ও দাম্পত্য-সংকটের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস 'আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি'। এই উপন্যাসের ভূমিকা লিখেছেন উপন্যাসটি রচনার আঠারো বছর আগে প্রয়াত মীর আসরার জামান। মৃত মানুষ কি লিখতে পারে? হ্যাঁ, পারে। যে পান্ডুলিপির অস্তিত্বই নেই, তা যদি অনন্ত আতিক চুরি করতে পারে, তাহলে প্রয়াত আচার্যও জীবিত লেখকের বইয়ের ভূমিকা লিখতে পারেন।
উপন্যাসটির ভূমিকায় মীর আসরার জামান লিখেছেন, 'আচার্য ও তাঁর অলীক পাণ্ডুলিপি নামক এই উপন্যাস যে পাঠ করবে তার বুদ্ধির মুক্তি ঘটবে। অভূতপূর্ব আঙ্গিকে রচিত এই কথাশিল্প যে পাঠ করবে তার দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পাবে, তার চিন্তাশক্তি প্রখর হবে এবং সে হীনম্মন্যতা, পরশ্রীকাতরতা ও আত্মসর্বস্বতা থেকে মুক্তি পাবে। সুললিত ভাষার এই কথাকাব্য যে শ্রবণ করবে তার শ্রবণশক্তি বৃদ্ধি পাবে। সাত মাস একুশ দিবস-রজনী ধরে রচিত এই আখ্যান যে পাঠ করবে তার আত্মপরিচয়ের সংকট বিদূরিত হবে। খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত এই সাহিত্যকর্ম যে পাঠ করবে সে আস্বাদন করতে পারবে সাহিত্যের প্রকৃত আস্বাদ।'
আমরা দুজন হাঁটতে থাকি— আমি আর স্বকৃত নোমান। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি আমরা। কথা বলতে বলতে হাঁটি।
— আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপির বিষয়বস্তু সম্পর্কে এরই মধ্যে জেনেছি আপনার পোস্ট থেকে। মনের মধ্যে কৌতুহল এটি কি কোনো বাস্তব কাহিনি?
— নাহ, নিশ্চয় না। এটা লেখকের নিজস্ব কল্পনা। আমার কল্পনার জগৎ থেকে উঠে এসেছে এই উপন্যাসের কাহিনি। খুব জোরের সঙ্গে বলেন নোমান।
— কিন্তু আপনি দীর্ঘদিন সেলিম আল দীনের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর এনিয়ে অনেক কথা হয়েছে— আপনি তার অপ্রকাশিত অনেক লেখা চুরি করেছেন এমন কথাও উঠেছে বিভিন্ন সময়। যদিও সেগুলোর উত্তর আপনি দিয়েছেন। কিন্তু অনেকেই বলছেন সেলিম আল দীন, তাঁর স্ত্রী এবং আপনি— এই বইয়ের তিনটি প্রধান চরিত্র।
— নাহ একেবারেই না। এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা যদি কেউ বলেন, সেটা ওই ব্যক্তির নিজের মত। এর সঙ্গে এই বইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
— আচ্ছা ঠিক আছে মানলাম। অন্য একটা বিষয় বলি।
— জি বলুন।
— অনেক বছর আগে বইমেলা যখন শুধুই বাংলা একাডেমি চত্বরে হতো তখন আপনার একটা বই পড়েছিলাম— ধূপকুশী। সেই থেকে এই পর্যন্ত আপনার লেখায় কি পরিবর্তন এসেছে?
— মোটা দাগে যদি বলেন, তখন থেকে এখন নিজেকে আরো পরিণত করার চেষ্টা করেছি। এছাড়া খেয়াল করে দেখবেন আমার উপন্যাসে সংলাপ অনেক কম। আমি সংলাপ কমিয়ে কাহিনিকে কাব্যময় ঢংয়ে বিস্তৃত করার চেষ্টা করছি।
— চলুন আপনার বইটা কিনবো!
— আমার একটা টেলিভিশনের সরাসরি অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় হয়ে এসেছে। আপনি কিছু মনে না করলে অনুষ্ঠানটা শেষ করে আসি?
— নিশ্চয়, আপনি যান।
ব্যস্ত পায়ে চলে যান স্বকৃত নোমান। আমি আবার একা একা হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে সামনে পড়ে যাই সুচনা আর নীলের। জিনিয়া কবির সুচনা আর নীল মাহাবুব বইমেলায় একটি বেসরকারি চ্যানেলের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে সুচনা। পেছনে পেছনে নীল।
— এই যে লেখক কবে আসবেন আমাদের অনুষ্ঠানে? সুচনার মুখে হাসি।
— আমি তো ভাই টিভিতে কথা বলতে পারি না!
— এসব ঢং কইরো না ভাইয়া। কবে আসবা বলো?
— দেখি আসবো একদিন।
— একদিন না ভাই, কালকেই আসেন! পাশ থেকে বলেন নীল মাহাবুব।
তাদের দুজনের সঙ্গে নানান বিষয়ে কথা চলতে থাকে। তাকিয়ে দেখি আবার হাজির স্বকৃত নোমান। এবার আমরা দুজন হেঁটে চলি অন্য প্রকাশের দিকে। সুচনা আর নীলের সঙ্গে কথা থাকে একদিন বিকেল পাঁচটায় তাদের প্রশ্নের মুখে পড়বো আমি!
এক কপি আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি কিনি। বইয়ের দাম পরিশোধ করতে চান স্বকৃত নোমান।
— ভাই কিছু মনে না করলে টাকাটা আমি দিই?
— টাকা দিতে হবে না, আপনি বরং একটা অটোগ্রাফ দেন!
বইয়ের পাতা উল্টে স্বকৃত নোমান লেখেন—
খান মুহাম্মদ রুমেল
গল্পকার
প্রিয় ভাই,
সুসময় একদিন আসবেই
সেদিন আবার দেখবো আপনার প্রতিভার বিস্ফোরণ।
নিরন্তর শুভ কামনা।
স্বকৃত নোমান।
লেখাটা দেখে ভীষণ ভালো লাগে আমার। আমরা দুজন আবার হাঁটি। এলোমেলো নানা বিষয়ে কথা বলি। মেলার মাঠে সন্ধ্যা নামছে ধীরে। স্বকৃত নোমানের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হয় দীর্ঘ আলাপ করতে চান তিনি। কিন্তু আমার কেন জানি খুব বিষন্ন লাগে। সন্ধ্যা আসলেই বিষন্নতার কাল!
ভিওডি বাংলা/এম







