• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

যে কারণে মন ভালো নেই লবণচাষিদের

ভিওডি বাংলা ডেস্ক    ১ মে ২০২৬, ০৯:৪০ এ.এম.
ছবি : সংগৃহীত

কালবৈশাখীর ঝড় ও ভারি বর্ষণে কক্সবাজার ও বাঁশখালী উপকূলের ৬৮ হাজার একর বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ লণ্ডভণ্ড। গত ২ দিনের বৈরী আবহাওয়ায় অন্তত ১ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার একর মাঠ। কম দামের চাপের মধ্যেই বড় লোকসানে প্রান্তিক চাষিরা। এ কারণে মন ভালো নেই লবণচাষিদের।

বিসিক জানায়, চলতি মৌসুমজুড়ে ১২ দিনের বৃষ্টিতে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন কম হয়েছে। তবে আগামী টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়ার আশা রয়েছে।

তীব্র দাবদাহে কক্সবাজার উপকূলে লবণ মাঠে বইছিল উৎপাদনের সুবাতাস। দৈনিক ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩২ হাজার মেট্রিক টনে। কিন্তু রেকর্ড উৎপাদনের সেই সময়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ঝড়ো ও ভারি বর্ষণ।

কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের মাইজপাড়ার লবণ চাষি কবির আহমদ। এবার তিনি ১২ একর জমিতে লবণ চাষ করেছেন। তবে গত দুই দিনের বৃষ্টিতে তার প্রায় দেড় হাজার মণ লবণ নষ্ট হয়েছে।

তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই লবণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছি।

এদিকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর উপকূলের হাজার হাজার একর লবণ মাঠ; হঠাৎ কালবৈশাখীর ঝড় ও ভারি বর্ষণে বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ এখন লন্ডভন্ড। মাঠের লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড বা কাই’। এখন উপকূলের প্রায় ৬৮ হাজার একর জমিতে বন্ধ লবণ উৎপাদন। গত দুই দিন পর আবহাওয়া পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হলে মাঠে এসে পানি সেচ কিংবা ত্রিপল ঠিক করছেন চাষিরা। তবে চাষিদের দাবি- ঝড়ো হাওয়া ও ভারি বর্ষনে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।

লবণ চাষি শফিউল আলম জানান, তার ১২ কানি জমিতে লবণ চাষ রয়েছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে এ জমির প্রায় ৩০০ মণ লবণ নষ্ট হয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে লবণ পানিতে ভেসে গেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে মাঠে গিয়ে ত্রিপল সরিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং আবহাওয়া ভালো হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। আবহাওয়া অনুকূলে এলে দ্রুত আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবেন। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে লবণ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লবণ চাষি সৈয়দ আলম বলেন, বৃষ্টিতে ৫ একর লবণ মাঠ তছনছ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৩০০ মণ লবণ নষ্ট হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামী ৭-৮ দিনের মধ্যেই আবার মাঠ থেকে লবণ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।

লবণ চাষি ছুরুত আলম বলেন, বর্তমানে প্রতি মণ লবণ ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ ন্যায্যমূল্য হিসেবে এ দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হওয়া উচিত। এখন মাঠে শ্রমিকের মজুরি, ত্রিপলের খরচ, জমির মূল্য ও ডিজেলের দাম-সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ প্রতি কেজিতে ১০ টাকার বেশি পড়ে। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে প্রতি কেজি ৫ টাকারও কম দামে। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে চাষিদের।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং, বাহারছড়া, হ্নীলা, রঙিখালি, ঝিমংখালী, খারাংখালী, মৌলভীবাজার, উপজেলা সদর, নাজির পাড়া, সাবরাং, নয়াপাড়া ও শাহপরীর দ্বীপের বেশকিছু মাঠের লবণ গলে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড বা কাই’ নষ্ট হয়ে গেছে।

বৃষ্টিতে চাষিদের অনেক ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে শাহপরীর দ্বীপের লবণ চাষি নুরুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত সাত থেকে আট দিন সময় লাগবে। বেশি লাভের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছিলাম। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশ মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে।’

নোয়াপাড়ার লবণ চাষি গিয়াস উদ্দিন বলেন, মঙ্গলবার এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে খালের দুই পাশে ৭০০ থেকে ৮০০ একর মাঠে লবণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সেইসঙ্গে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদিত লবণ বিক্রিও করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘এক মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩০০ টাকা আর বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা। লোকসান দিয়ে আর কত লবণ বিক্রি করব?’ 

‘গত চার মাস লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করেছি। দাদনের টাকা পরিশোধ করা দূরে থাক, সংসার চালাব কী দিয়ে ভেবে পাচ্ছি না’, বলে আক্ষেপ করেন গিয়াস উদ্দিন।

সাবরাং এলাকার লবণ চাষি আলী আহমদ বলেন, ‘বেশি লাভের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছিলাম। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে লবণ মাঠের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’

‘ঋণ করে মাঠ নিয়েছি, কালবৈশাখীতে সব শেষ! এমনিতেই লবণের দাম কম। এখন কীভাবে ঋণ শোধ করব বুঝতে পারছি না’, বলেন তিনি।

টেকনাফ সাবরাং লবণ চাষি কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ আহম্মদ বলেন, ‘ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির কবলে পড়ে লবণচাষিরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সংকটের অজুহাত দেখিয়ে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে। লবণ আমদানি হলে প্রান্তিক চাষিদের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে। লবণ উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও ব্যবসায় সঙ্গে টেকনাফে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ জড়িত।

তবে বিসিক জানিয়েছে, টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।

কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া বলেন, আকস্মিক বৃষ্টিতে সাধারণত লবণ পুরোপুরি নষ্ট হয় না। কারণ চাষিরা আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় কাজ করেন। তবে কখনো কখনো হঠাৎ বৃষ্টির কারণে হারভেস্টের জন্য প্রস্তুত কিছু লবণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি জানান, এবারের বড় ক্ষতি হয়েছে মূলত উৎপাদনে। বৃষ্টির কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। দৈনিক গড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ধরা হলে, এতে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন লবণ কম উৎপাদন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাত শেষ হলে আবার তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। যদি টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ অনুকূল আবহাওয়া থাকে, তাহলে লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হবে।

চলতি মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে গত সাড়ে পাঁচ মাসে উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন। এছাড়া গত মৌসুমের ৪ লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুত রয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বর্তমানে বিরাজমান আবহাওয়া আরও ২-৩ দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর ৫ মে থেকে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকবে না, কারণ তখন সাগরে কোনো লঘুচাপ বা বায়ুচাপজনিত প্রভাব থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, ১৪ মে থেকে এলাকায় তীব্র দাবদাহ শুরু হতে পারে, যা টানা ১০–১৫ দিন স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ৬ মে থেকেই লবণ চাষিরা পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ভিওডি বাংলা/এসআর

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
বাসের চাপায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত
বাসের চাপায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত
দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান: ইসলামপুরে মিলছে সুপেয় পানি
দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান: ইসলামপুরে মিলছে সুপেয় পানি
সৌদিতে নিহতের ২০ দিন পর দেশে ফিরলো প্রবাসীর মরদেহ
সৌদিতে নিহতের ২০ দিন পর দেশে ফিরলো প্রবাসীর মরদেহ