• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বে নতুন মোড়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক    ১ মে ২০২৬, ০৮:২২ এ.এম.
ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছে—এমন শঙ্কার মধ্যেই পাল্টা ‘দীর্ঘস্থায়ী ও বেদনাদায়ক আঘাত’ হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে তেহরান, যা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সচল করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ সতর্কবার্তা দেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের দুই মাস অতিবাহিত হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র পথটি এখনো বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বের ২০% তেল ও গ্যাস সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ ঘনীভূত হয়েছে।

৭ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টাগুলো বর্তমানে অচলাবস্থায় রয়েছে। ইরানের তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় তেহরান এখনও প্রণালিটি বন্ধ করে রেখেছে, যা তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

রয়টার্সকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে দেশটিতে নতুন করে ধারাবাহিক সামরিক হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ব্রিফিং নেওয়ার কথা ছিল।

এ ধরনের বিকল্পগুলো দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন পরিকল্পনার অংশ হলেও, বুধবার প্রকাশিত 'অ্যাক্সিওস'-এর প্রতিবেদনটি বাজারে আসার পর তেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও পরবর্তীতে তা ১১৪ ডলারের আশেপাশে নেমে আসে।

ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’র প্রতিবেদন অনুসারে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেছেন—মার্কিন আলোচনার দ্রুত ফলাফল আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারী যেই হোক না কেন, খুব অল্প সময়ে ফলাফল পাওয়ার আশা করা আমার মতে বাস্তবসম্মত নয়।’

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে তেহরানের কিছু এলাকায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তার শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে মেহর নিউজ এজেন্সি। তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ছোট ড্রোন এবং মনুষ্যবিহীন নজরদারি বিমানকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে।

এদিকে, আঞ্চলিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার নাগরিকদের ইরান, লেবানন ও ইরাক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং বর্তমানে সেখানে অবস্থানরতদের অবিলম্বে দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছে।

ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে আবারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই পেট্রোলের দাম ‘দ্রুত নেমে যাবে’ পড়ে যাবে—যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

ইরানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করলেও ট্রাম্প বলেছেন, ফিফা প্রেসিডেন্ট জান্নি ইনফান্তিনোর জোরালো অবস্থানের পর আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে তার কোনো আপত্তি নেই।

ইরানের ‘দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক হামলার’ সতর্কবার্তা

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন কোনো মার্কিন হামলা—তা যতই সীমিত হোক না কেন—অঞ্চলের মার্কিন অবস্থানগুলোতে ‘দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক আঘাত’ ডেকে আনবে।

অন্যদিকে, মহাকাশ বাহিনীর কমান্ডার মজিদ মুসাভি ইরানি গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা দেখেছি আপনাদের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর কী হয়েছে, আপনাদের যুদ্ধজাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা একই পরিণতি দেখব।’

ইরানিদের উদ্দেশে এক লিখিত বার্তায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি বলেছেন, তেহরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ‘শত্রুদের খবরদারি’ দূর করবে।

তিনি ইঙ্গিত দেন, তেহরান এই জলপথের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়।

তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে আসা বিদেশিদের জন্য এখানে সাগরের তলদেশ ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন, এই অচলাবস্থা বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চললে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও চরম ক্ষুধার মুখে পড়বে।

বিভিন্ন বিকল্পের পরিকল্পনা

যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করার পাশাপাশি ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্পের ব্রিফিংয়ের একটি পরিকল্পনায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালির অংশবিশেষ দখল করার উদ্দেশ্যে স্থলবাহিনী ব্যবহারের প্রস্তাবও রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প মার্কিন অবরোধের মেয়াদ বাড়ানো বা একতরফা বিজয়ের ঘোষণার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন।

সংঘাত পরবর্তী পরিস্থিতির প্রস্তুতি হিসেবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ১ মে'র মধ্যে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’ নামক একটি নতুন জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে। ফ্রান্স ও ব্রিটেন এই জোটে আগ্রহ দেখালেও তারা জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ হলেই কেবল তারা সহায়তা করবে।

মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান উত্তেজনা এড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে বার্তা আদান-প্রদান করছে বলে একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে।

ভিওডি বাংলা/এসআর

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
একই সময়ে শেষ হতে পারে ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ
পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ একই সময়ে শেষ হতে পারে ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলার
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলার
৭২ ঘণ্টায় মার্কিন অবরোধ ভাঙল ৫২টি ইরানি জাহাজ
৭২ ঘণ্টায় মার্কিন অবরোধ ভাঙল ৫২টি ইরানি জাহাজ