• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

মেলার মানুষ

নিঃসঙ্গ নজরুল মঞ্চ এবং…

   ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ০৭:১১ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

বইমেলার ভিড়, বইমেলার জৌলুস পুরোটাই এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে। অথচ মেলা হয় বাংলা একাডেমি চত্বরেও। মূলত জায়গার অভাবে মেলা বিস্তৃত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এখন সৃজনশীল প্রকাশকরা সব স্টল প্যাভিলিয়ন নিয়ে বসেন মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। যতদূর মনে পড়ে ২০১৪ সাল থেকে মেলার পরিধি বেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত ঠেকেছে। এর আগে পর্যন্ত বাংলা একাডেমি চত্বর ঘিরে ঠাসাঠাসি করে বসতেন প্রকাশকরা। মনে আছে মেলায় ঢোকার জন্য তখন বাংলা একাডেমির দক্ষিণ দিকের গেট ব্যবহার হতো। আর বের হওয়ার জন্য উত্তর পাশের অগ্রণী ব্যাংক লাগোয়া গেটটি ব্যবহার হতো। 

বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের উত্তর পাশে একটি বটগাছ। লালচে রংয়ের টাইলসে বাঁধানো গাছের গুঁড়ি। কাজী নজরুল ইসলামের একটি ভাস্কর্য। এই নিয়ে নজরুল মঞ্চ। মেলার সময় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচণের জন্য ব্যবহার হতো নজরুল মঞ্চ। মেলার পুরোটা সময় ভীষণ ভিড় লেগে থাকতো এই নজরুল মঞ্চ ঘিরে। লেখক পাঠক দর্শনার্থীরা মিলে ব্যাপক আড্ডা জমাতেন নজরুল মঞ্চের চারপাশ ঘিরে। বর্ধমান হাউসে ঢোকার সিঁড়িতেও বসতেন বহু মানুষ।

মঙ্গলবার বইমেলার চতুর্থ দিনে হাঁটতে হাঁটতে হাজির হই বাংলা একাডেমি চত্বরে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বহু মানুষের শোরগোলে মুখরিত চারপাশ, আর বাংলা একাডেমি অংশ তখন নীরব নিথর। এই অংশে মূলত বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা সরকারি বিভিন্ন প্রকাশনা এবং কিছু পত্রিকার স্টল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভিড় নেই। এমনটাই হয়ে আসছে গেলো বেশ কয়েক বছর ধরে। ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে বসি নজরুল মঞ্চের বাঁধানো বেদিতে। মাথার ভেতর স্মৃতিরা ভর করে। এক সময় মেলার দিনগুলোতে কি ভীষণ ব্যস্ততা ছিলো। কত কত গুণি লেখক প্রকাশকের আনাগোনায় রঙিণ হয়ে থাকতো এই প্রাঙ্গণ। সেই সময় প্রায়ই দেখা যেতো মেলার মাঠ ধরে আয়েশি ভঙ্গিতে হাঁটছেন হুমায়ুন আজাদ। সব সময় তাকে ঘিরে থাকতো সাত আটজনের একটি দল। সেই দলে একবার আমিও ভিড়েছিলাম। তখন আমি কলেজ পড়ুয়া কিশোর। শরীরে মফস্বলী গন্ধ। উচ্চারণে গেঁয়ো জড়তা। মেলায় গেছি কয়েক বন্ধুর সঙ্গে। এক বন্ধু দেখায়— ওই দেখ হুমায়ুন আজাদ। হেঁটে হেঁটে কথা বলছেন তিনি। আর তার পেছনে কিছু তরুণ লেখক। আমার এক বন্ধু অটোগ্রাফের জন্য খাতা বাড়িয়ে দেয়। দেখাদেখি আমিও। হুমায়ুন আজাদ আমার নাম জিজ্ঞেস করেন। জানতে চান কোথায় পড়ি। কলেজ ছাত্র শুনে প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন। বলেন— বলেন তোমরা তো অনেক ছোট। আমার কোনো বই পড়েছো?
—    পড়েছি স্যার। লাল নীল দীপাবলি।
—    আর কিছু পড়োনি?
—    ”ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না”। আর পড়েছি ”আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’।
এরপর আর কি কথা হয়েছিলো মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে— এক পর্যায়ে কেউ একজন তার হাতে একটা বই তুলে দেন। আর সেই লেখকের হাত থেকে বইটা নিয়ে হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন— তুমি আবার কবিতা লেখা শুরু করেছো! খুবই ভালো! কে সেই কবি এখন আর মনে নেই। তবে এটি মনে আছে হুমায়ুন আজাদ আসতেন এবং সম্রাটের মতো বসে থাকতেন আগামী প্রকাশনীতে। একদিন আমি আর লেখক নাট্যকার শফিকুর রহমান শান্তনু হাঁটতে হাঁটতে আগামী প্রকাশনীর সামনে এসে দাঁড়াই। শান্তনু আর আমি কলেজে একই ক্লাসে পড়তাম। হুমায়ুন আজাদ ভেতরে একা বসে আছেন। শান্তনু সামনে যেতে সাহস পায় না। কিসের ভয় শান্তনুর?
—    আমরা তো বই কিনবো না! নেড়েচেড়ে চলে গেলে উনি যদি রাগ করেন? শান্তনু বলে!
—    আরে চল, উনি রাগ করবেন না। কয়দিন আগে ওনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
—    কি বলিস? কোথায় কথা হলো?
—    আরে এই মেলাতেই। ওনার অটোগ্রাফও নিয়েছি।
আমার কথায় শান্তনু কতটা ভরসা পেয়েছিলো জানি না। তবে সেদিন আমরা হুমায়ুন আজাদের বই দেখে টেখে চলে এসেছিলাম। বই কিনবো— টাকা কোথায় পকেটে!
 একদিন এসেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ, তার গাড়ি পর্যন্ত বাংলা একাডেমির ভেতরে ঢুকে গেল। অটোগ্রাফ নেয়ার সারি চলে গেল মেলা ছাড়িয়ে...। আমিও সেই ভিড়ে দাঁড়িয়ে যাই। পকেট হাতরে দুশো  টাকার মতো বের করতে পারি। তাই কিনে ফেলি হিমু সিরিজে বই— চলে যায় বসন্তের দিন। অটোগ্রাফ নিই বইয়ে।
তখনো ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হকের কিছুটা তারকাখ্যাতি ছিল। সুমন্ত আসলাম তারকা হয়ে উঠছিলেন। যাদের গায়ে লেগেছিল জনপ্রিয়তার সুবাতাস তারা ফরফর করে উড়ছিলেন। আমাদের যাদের ভেতরে তখন লেখার বাসনা— এইসব লেখকদের দেখি আর মনে মনে কিছুটা ঈর্ষা করি। আর ভাবি সিরিয়াস সাহিত্য করে একিদন বদলে দেবো সব!

মনে আছে, সেই কুড়ি বছর আগে, বাংলা একাডেমির বটতলা দিয়ে আলো-আঁধার সন্ধ্যায় হেঁটে যাচ্ছিলেন আসাদ চৌধুরী। একটু  আগে কিনেছি তার ’ নদীও বিবস্ত্র হয়’— দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরলাম, নাম বললাম, অটোগ্রাফ নিলাম। তিনি ব্যস্ত ছিলেন বলে দ্রুত চলে গেলেন।  যাওয়ার আগে বলে গেলেন, একদিন গল্প হবে। এরপর তার সঙ্গে কত দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। একবার বরিশাল ফেরত লঞ্চে পাশাপাশি কেবিনে আমরা সারারাত ছিলাম। আমার সঙ্গে বেশ কজন বন্ধু ছিলো। সারারাত করেছি আমরা। এক পর্যায়ে আসাদ চৌধুরী বন্ধ করে দেন তার কেবিনের জানালা। আমাদের আর গল্প করা হয়নি। বছর দুয়েক আগে কানাডার পিকারিং শহরে তিনি মারা গেলেন। আসাদ চৌধুরীর মৃত্যুর খবর শুনে কেন যেন খুব কেঁদেছিলাম।
বসে থাকতে থাকতে নজরুলের ভাস্কর্যের দিকে তাকাই। পাতার ফাঁক গলে বিকেলের আলোয় ঝলমল করে তার মুখ। মনে পড়ে বাংলা সাহিত্যকে কী আশ্চর্য মনীষা দিয়ে গেছেন তিনি।

এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর রণতূর্য নিয়ে তিনি এসেছেন সাহিত্যের আকাশে। তারপর থেকে জ্বলজ্বল করছেন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে।  মাত্র ২৩ বছরের লেখক জীবনে বাংলা সাহিত্যকে যে প্রাচুর্য তিনি উপহার দিয়েছেন তার তুলনা কোথায়? সাহিত্যের সব শাখায় সব্যসাচীর মতো চলেছে তার কলম। তবে তার প্রধান পরিচয় তিনি কবি। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

১৮৯৯ সালের ২৪শে মে নজরুলের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। নয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে ঝঞ্ঝা মুখর জীবন তার। মক্তবে পড়িয়েছেন। মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন। এক পর্যায়ে যুক্ত হয়ে যান লেটো গানের দলে। লেটো দলে থাকার সময়ই তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। এ সময় তার বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ণের শুরু। ১৯১০ সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে ছাত্রজীবনে ফিরে আসেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় তাকে আবার কাজে ফিরতে হয়। এ সময় রেস্তোরাঁয় রুটি বানানোর কাজ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। রুটির দোকানে কাজের ফাকে একা একা কবিতা ছড়া লিখতেন নজরুল। তখন নজরে পড়েন পুলিশের দারোগা রফিজউল্লাহর। রফিজউল্লাহ নজরুলকে ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৭ সালের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট না দিয়ে কাজী নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক থেকে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। কাজী নজরুল সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ফিরে আসেন কলকাতায়। ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য অফিসে বসবাস শুরু করেন। ১৯ ২২ সালে নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯২৩ সালে কাজী নজরুল জেলে বন্দি থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। এই আনন্দে নজরুল জেলে বসে লেখেন অমর কবিতা আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে।

১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। হারিয়ে যায় বাকশক্তি। সে বছরি নজরুল হারিয়ে ফেলেন মানসিক ভারসাম্যও। ১৯৭২ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। তাকে বাংলাদশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। 

উত্তরের বাতাস বয়। বটগাছের পাতায় ফরফর শব্দ হয়। একটা হলুদ পাতা ঝরে পড়ে মাথার ওপর। মনে মনে ভাবি মানুষের জীবনও তো এমন ঝরে পড়ার নিয়তি। তবে ঝরে যাওয়ার আগে কেউ কেউ পেয়ে যান অমরত্ব। তাদের আমরা বুকের মধ্যে বড় মমতায় পুষি!

ভিওডি বাংলা/ এম


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়