সর্ষের মধ্যে ভূত রেখে প্রধান উপদেষ্টা সফল হবে না- সালাহউদ্দিন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
সংস্কারের বিষয়ে অন্তবর্তীকালীন সরকার ‘বেশি সময় নেয়ার কৌশল নিলে’ জাতি তা মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন সালাহ উদ্দিন আহমেদ। বুধবার দুপুরে এক আলোচনা সভায় নির্বাচনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এই মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনমুখী সংস্কারের জন্য যে সমস্ত সংস্কার স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়ন করা দরকার আপনারা সেটা চিহ্নিত করুন এবং সকল মহলের সাথে, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করুন এবং সেটার আইনি সংস্কার করুন। আইনি সংস্কারের পর যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করার দরকার হয় সেটা করবেন … এরজন্য কত সময় লাগবে আমরা জানি।বর্তমানে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ প্রায় সমাপ্ত করে এনেছে… আমাদের কাছে তালিকা আছে… মার্চের ২ তারিখের মধ্যে একটা পরিস্কার ভোটার তালিকা প্রণয়ন হয়ে যাবে… এরপর শুনানি আপত্তি চলবে সেটা ধারাবাহিক প্রসেস এবং সেটাও মাস দুইয়েকের ভেতরে হয়ে যাবে সেই প্রজ্ঞাপনও আমরা পেয়েছি নির্বাচন কমিশন থেকে… ডিলিমিটেশন সময়মত হবে এবং অন্যান্য নির্বাচনী কার্য্ক্রম যেগুলো আছে আইনি সংস্কার ছাড়া সেগুলো খুব বেশি সময় নেয়ার কথা নয়। সুতরাং বেশি সময় নেয়ার জন্য আপনারা কোনো কৌশল অবলম্বন করলে জাতি সেটা মেনে নেবে না।’
অন্তবর্তীকালীন সরকারের উদ্দেশ্যে সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনারা সংসদ নির্বাচন দিতে দেরি করলে জনগনের সামনে তার যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন। আপনারা কি যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন? আপনারা কি আমাদের বক্তব্য কানে তোলেন? এখনো সময় আছে, আমি মনে করি আপনারা সবার সাথে আলোচনা করে একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রদান করুন এবং সেই নির্বাচনী রোডম্যাপ জনগন যৌক্তিক মনে হয় তা তারা মেনে নেবে।’
জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলের আঞ্চলিক সম্পাদক পরিষদের উদ্যোগে ‘জাতীয় ঐক্য ও বর্তমান বাস্তবতা’ শীর্ষক এই আলোচনা সভা হয়।
‘সংস্কারের শ্লথ গতি নিয়ে প্রশ্ন’
বুধবার বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করার প্রসঙ্গ টেনে সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সংস্কারের সকল রিপোর্ট জমা হবে…জানুয়ারিতে আলোচনা হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে এবং যারা সমাজের বিভিন্ন শ্রেনীর প্রতিনিধিতত্ব করেন সামাজিক শক্তিগুলোর সাথে… । জানুয়ারি পার হয়ে গেলো… আজকে ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ। এখন বলছেন মধ্য ফেব্রুয়ারিতে আলোচনার জন্য তারা প্রস্তুত হবেন… তারপরে কতদিন আলোচনা করবেন জানি না। আবার আজকে পত্রিকায় দেখলাম, কালকে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, শেখ হাসিনা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছে। তো শেখ হাসিনার দোসরা তো আপনার উপদেষ্টা পরিষদেরও অন্তর্ভুক্ত আছে …আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম আপনি তাদেরকে বাদ দেন নাই। শেখ হাসিনার দোসরা প্রশাসনে আছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আাছে… আমরা বলেছিলাম ফ্যাসিবাদের দোসরদের বহাল রেখে আপনি বেশি দূরে যেতে পারবে না। আপনি কিছু কিছু শুনেছেন… মনে হয়েছে এতো শ্লুথ গতি যে আপনি কি সংস্কার করবে আমাদের বোধগম্য নয়।’
‘সরকারে সরিষার ভেতরে ভূত’
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিচার বিভাগ সংস্কারের প্রতিবেদনে কি আসছে আমি জানি না… তবে এই সমস্ত নিশিরাতের বিচারকদের বহাল রেখে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে চূড়ান্তভাবে স্বাধীন করা যাবে কিনা, রাখা উচিত হবে কিনা তাদেরকে বহাল রেখে… আমার সন্দেহ আছে। সরিষার ভেতরে ভূত রেখে কখনো মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা আপনি সফল হতে পারবেন না। সুতরাং বিচার ব্যবস্থা হোক, প্রশাসন হোক, নির্বাচনী ব্যবস্থা হোক সর্বত্র ফ্যাসিবাদের দোসরদের আপনাকে ক্লিন করতে হবে, পরিস্কার করতে হবে এবং একটি গণতান্ত্রিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে আমরা যে সাংবিধানিক রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই সেই সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন প্রথম নির্বাচনমুখী সংস্কারের।’
তিনি বলেন, ‘জনগনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করুন প্রথমত সার্বভৌমত্বের বর্হি প্রকাশ হবে সেই সার্বভৌম পার্লামেন্টে সেখানে সকল ধরনের আলোচনা হবে। মধ্য মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি বিস্তর আলোচনা এবং বিস্তর কমিটি গঠন করার যে প্রতিশ্রুতি আমাদের আছে সেই প্রতিশ্রুতি আমরা আপনাদের ক্ষমতা গ্রহনের বহু আগে দিয়েছি ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই … সেটা ৩১ দফা। সেই ৩১ দফার মধ্যে মৌলিক বিষয়গুলো উদ্ধৃত আছে… আমরা আহ্বান করেছি এর মধ্যে যদি কোনো পরামর্শ থাকে যেগুলো আমাদের গ্রহন করতে হবে জাতির কল্যাণের জন্য সেটা আমরা গ্রহন করব সাদরে। আমরা মূলনীতিগুলো ৩১ দফা উদ্ধৃত করেছি… সংস্কার কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে পরবর্তিতে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার জনগনের কাছে যাবে এবং জনগনের চাহিদা অনুযায়ী এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো গঠন করবে এবং জাতীয় ঐকম্যমত সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সেই সংস্কারগুলো গ্রহীত হবে এবং সেটা বাস্তবায়ন হবে তাহলেই জাতির মঙ্গল।’
‘সরকারের দ্বি-চারিতা
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনারা আওয়ামী লীগকে কোনো কর্মসূচি করার জন্য রাজপথে নামতে দেবেন না… মানি, সমর্থন করি। কিন্তু এভাবে আওয়ামী লীগকে আপনি ক‘দিন রাজপথে পুলিশ দিয়ে ঠেকাবেন। আপনারা বলবেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে আমরা চাই না, আওয়ামী লীগ এদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। কিন্তু কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন? আইনি কোনো পদক্ষেপ এই সরকার নিয়েছে? না। আমরা বলেছিলাম সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য বিচারের ব্যবস্থা করা হোক এবং সেই নিরিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করার আমরা দাবি জানিয়েছিলাম, জনগন দাবি করেছে… এই সরকার অধ্যাদেশ ও আইন সংশোধনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন হঠাৎ করে তারা ক্যাবিনেট মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিলো এটা করা যাবে না। কেনো? আওয়ামী লীগের একদিকে চাইবেন রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক, আবার তাদের বিচার করবেন না, আবার পুলিশ দিয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি আপনারা বাধা দেবেন এতো স্ববিরোধিতা ঠিক নয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্কার করে বলতে চাই, বাংলাদেশের মানুষ গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মধ্যদিয়ে এদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখান করেছে, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের রাজনীতিকে প্রত্যাখান করেছে, তাদেরকে বিতাড়ন করেছে। সেই আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগ নামে রাজনীতি করতে পারবে না… এই আওয়াজ আমরা উঠাচ্ছি। আমরা আওয়ামী লীগের গণহত্যার এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য রাজনৈতিক সংগঠন হিসে্বে বিচার দাবি করছি। বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্ধারণ হোক বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে পারবে কিনা নির্বাচন করতে পারবে কিনা। সংবিধান বিধান সংযুক্ত আছে সেই অনুযায়ী আপনারা আইন প্রণয়ন করুন। কেউ কেউ বলতে শোনা যাচ্ছে যে, মানবতা বিরোধী অপরাধ আদালতে যাদের বিচার হচ্ছে সেই বিচারে হয়তবা অবজারবেশন আসবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি সম্পর্কে… সেটা অত্যন্ত দূর্বল অবজারবেশন। তখনও আপনাদেরকে(অন্তবর্তীকালীন সরকার) প্রশাসনিক আদেশ দিতে হবে, তখনও আপনাদেরকে আইন প্রণয়ন করতে হবে সেই অবজারবেশনের নিরিখে।কিন্তু এখন যদি আপনারা সোচ্চার হন বিচারের জন্য বাংলাদেশের মানুষ চায় বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ রাজনীতির একদমন নির্মূল হয়ে যাক… সেই ব্যবস্থা আপনারা নিতে পারেন। বিচার বিভাগের সংস্কারের রিপোর্টে সেই বিষয়গুলো আসবে কিনা আমি জানি না।’
সংগঠনের সভাপতি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খানের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম সম্পাদক সেলিম পারভেজের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক এরফানুল হক নাহিদসহ আঞ্চলিক সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
ভিওডি বাংলা/এম







