বিবিএস জরিপ:
দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারে বৈষম্য ও দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিধি দ্রুত বাড়লেও এর ব্যবহারিক দক্ষতা, প্রবেশাধিকার এবং শহর-গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে এমনই চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি বড় ধরনের ঘাটতির বিষয়টিও স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস কার্যালয়ে ‘আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ শীর্ষক এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে দেশের বর্তমান ডিজিটাল ব্যবহার পরিস্থিতি, দক্ষতার মাত্রা এবং ভৌগোলিক বৈষম্য নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।
জরিপ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের ভেতরেই স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায় শহর ও গ্রামের মধ্যে। শহরাঞ্চলে ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও গ্রামীণ এলাকায় এই হার মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে দুই এলাকার মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্টে, যা ডিজিটাল বৈষম্যের একটি বড় নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়লেও ব্যবহারকারীদের দক্ষতার চিত্র খুব বেশি অগ্রসর নয় বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে। জরিপে দেখা গেছে, ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী এখনো কেবল মৌলিক ডিজিটাল কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ দক্ষতা হলো কপি-পেস্ট করা। অর্থাৎ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এখনো ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠেনি।
মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশে অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেলেও মালিকানার দিক থেকে এখনো ঘাটতি রয়েছে। মোট জনসংখ্যার ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও ব্যক্তিগত মালিকানায় রয়েছে মাত্র ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশের কাছে। অন্যদিকে কম্পিউটার ব্যবহারের হার এখনো অত্যন্ত সীমিত—মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ কম্পিউটার ব্যবহার করেন বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিবার পর্যায়ে ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকা সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিপরীতে পঞ্চগড় জেলায় এই হার সবচেয়ে কম। একইভাবে কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঢাকার অবস্থান শীর্ষে থাকলেও ঠাকুরগাঁও জেলা সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে, যা দেশের ভেতরে প্রযুক্তি ব্যবহারের অসম বণ্টনকে আরও স্পষ্ট করে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও জরিপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গত তিন মাসের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যবহারকারী সরকারি চাকরি সংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধান করেছেন, যা সর্বোচ্চ অনলাইন কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পাশাপাশি ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবহারকারী খেলাধুলা বিষয়ক তথ্য খুঁজেছেন। তবে অনলাইনে কেনাকাটার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম-মাত্র ১১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী ই-কমার্স সেবা গ্রহণ করেছেন।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে জরিপে। এতে দেখা যায়, ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে তারা সাইবার আক্রমণের শিকার হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। তবে ঝুঁকির বিষয়েও সচেতনতা রয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহারকারী ভাইরাস ও ম্যালওয়্যারকে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অন্যদিকে ইন্টারনেট ব্যবহারে একটি বড় বাধা হিসেবে উচ্চ খরচের বিষয়টি উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন, ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারে অনাগ্রহী বা সীমিত ব্যবহার করেন। ফলে ডিজিটাল সেবার বিস্তার হলেও তা সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে এখনো বাধার মুখে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জরিপের ফলাফল দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার ঘটলেও অন্যদিকে দক্ষতা উন্নয়ন, সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিতকরণ এবং শহর-গ্রামের বৈষম্য কমানো না গেলে কাঙ্ক্ষিত ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে বিবিএসের এই জরিপে স্পষ্ট হয়েছে, দেশের ডিজিটাল অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও তা এখনো সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। কাঠামোগত ও দক্ষতাগত ঘাটতি দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য অর্জন দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভিওডি বাংলা/জা







