হরমুজ উত্তেজনা
রাশিয়ার যে চালে ভেস্তে যেতে পারে ট্রাম্পের পরিকল্পনা

মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে তীব্র ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ এবং চীনের জ্বালানি চাহিদা পূরণে রাশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন—বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে বর্তমানে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ প্রবেশ বা বের হতে পারছে না। সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া এই অবরোধ বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযানে ১৫টি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি সুপার ক্যারিয়ার ও ১১টি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার। পাশাপাশি কয়েক ডজন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ১০ হাজারের বেশি মার্কিন মেরিন ও এয়ারম্যান এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে।
সেন্টকমের দাবি, ইতোমধ্যে অন্তত ছয়টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজকে থামিয়ে তাদের গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও একটি জাহাজ অবরোধ ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন রয়েছে, তবে মার্কিন পক্ষ বলছে সেটি এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরেই অবস্থান করছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত প্রায় ২৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে বাধা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।
চীন ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হওয়ায় নতুন পরিস্থিতিতে দেশটি চাপে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুযায়ী, বেইজিং এখন আর ইরানি তেল আমদানি করতে পারবে না, যা তাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এমন প্রেক্ষাপটে রাশিয়া নতুন কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। বেইজিং সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানান, চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে মস্কো সক্ষম এবং দুই দেশের সম্পর্ক যেকোনো পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই ঘোষণা শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়, বরং চীনের বাজারে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর একটি কৌশল, যা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, এই অবরোধের লক্ষ্য কেবল ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
তারা বলছেন, এই কৌশল সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের প্রভাব আরও শক্তিশালী হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন খরচ, নিত্যপণ্যের মূল্য এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিতে। বিশেষ করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বাড়লে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা তুঙ্গে। একদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারি ও অভিযান, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে চীন-রাশিয়ার অবস্থান এবং ইরানের সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে এই সংকট কোন দিকে গড়াবে—নতুন সংঘাতের দিকে, নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
ভিওডি বাংলা/এমএস







