• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষ

এক দুর্ঘটনায় শেষ পুরো পরিবার, কেউ হারিয়েছেন বাবা-মা

কুমিল্লা প্রতিনিধি    ২২ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৯ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেন সংঘর্ষে নিহত ১২ জনের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও তিন শিশু রয়েছে। এর মধ্যে কেউ হারিয়েছেন পুরো পরিবার। কেউ হারিয়েছেন বাবা-মা। স্বামী হারিয়েছেন নববধূ। এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

হাসপাতালের হিমঘরের সামনে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। কেউ কাগজপত্র হাতে প্রিয়জনের লাশ বুঝে নেওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন।

শনিবার (২১ মার্চ) রাতে ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীগামী মামুন পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা গামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষে ঘটনা স্থলেই ১২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় অন্তত ১৫ জন। ময়নামতি হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মোমিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন রয়েছেন। তারা হলেন—লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর কাদিরা গ্রামের বুদ্দিনগর এলাকার লাইজু বেগম (২৬), তার মেয়ে খাদিজা আক্তার (৬) ও ময়িরম আক্তার (৩)। 

নিহত লাইজু বেগমের বোন হাজেরা আক্তার বলেন, "আমার বোনের শ্বশুরবাড়ি ঝিনাইদহ জেলায়। তার স্বামী মামুন পরিবহনে চালক হিসেবে চাকরি করেন। ঈদ উপলক্ষে তারা সবাই আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। ঢাকায় এসে বোনের স্বামী তাদের লক্ষ্মীপুরগামী মামুন পরিবহনের বাসে তুলে দেন এবং নিজে অন্য একটি গাড়িতে কাজে যোগ দেন।

লাইজু আরও বলেন, রাত ৩টার দিকে আমরা লক্ষ্মীপুর স্টেশনে গিয়ে ফোন করলে সেটি বন্ধ পাই। পরে বোনের স্বামীকে জানালে তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন বাসটি দুর্ঘটনায় পড়েছে। পরে কুমিল্লার হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার বোনের পুরো পরিবারই নিহত হয়েছে। 

এই দুর্ঘটনায় লক্ষ্মীপুরে আরও একজন হিত হন। তিনি হলেন-সদর উপজেলার মো. সিরাজুল দৌলার মেয়ে সায়েদা (৯)। সায়েদা আক্তারের মামা মো. শুভ  বলেন, আমার বোনের স্বামী ফরিদপুরে একটি মসজিদের ইমাম। ঈদের ছুটিতে তারা দুই মেয়ে নিয়ে বাড়িতে আসছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনায় আমার ভাগনি মারা যায়। এ ঘটনায় আমার দুলাভাই সিরাজুদৌল্লা (৫০), বোন রাজিয়া বেগম (৩৬) এবং আরেক ভাগনি আপনান আক্তার (১৮) গুরুতর আহত হয়েছে। বর্তমানে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। 

নিহত অন্যরা হলেন- নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার সালামত উল্লাহর ছেলে মো. বাবুল চৌধুরী (৫৩), সুধারাম থানার মো. সেলিমের ছেলে নজরুল ইসলাম রায়হান (৩৩), চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার মোমিনুল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম (৬৮),  ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মো. মোকতার বিশ্বাসের ছেলে মো. জোয়াদ বিশ্বাস (২০), মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার ওহাব শেখের ছেলে ফসিয়ার রহমান (২৬), চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের বিল্লাল হোসেনের ছেলে সোহেল রানা (৪৬), যশোরের চৌগাছার ফকির চাঁদ বিশ্বাসের ছেলে মো. সিরাজুল ইসলাম (৬২) ও একই এলাকার সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী কোহিনুর বেগম (৫৫)।

স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে নোয়াখালীর শ্বশুরবাড়িতে ঈদ করতে যাচ্ছিলেন যশোরের গাড়িচালক পিন্টু ইসলাম। তিনি জানান, পথে ঢাকায় নেমে যান তিনি। রাত ১২টার দিকে দুই মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পুলিশের ফোন পেয়ে ছুটে এসে দেখেন, তার পুরো পরিবার নিথর দেহে পরিণত হয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব জানি না। ঈদের আনন্দ করতে যাচ্ছিল তারা, আর কোনোদিন তাদের দেখব না, এটা আমি মানতে পারছি না।”

জুহাদ বিশ্বাসের স্ত্রী রুমি আক্তার দেড় বছরের কন্যা মরিয়মকে কোলে নিয়ে বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, “ঈদের আগে মেয়েকে দেখতে আসতে পারেনি। ঈদের রাতে মেয়ের কাছে যাওয়ার পথে সে চলে গেল। আমার আর আমার মেয়ের কেউ রইল না।”

হিমঘরের সামনে ভাগ্নির লাশ নিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় নিহত সায়েদার খালা সাহিদা সুলতানাকে। তিনি জানান, সাঈদার বাবা-মা গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “মেয়েটা আর বাঁচল না। তার বাবা-মাও বাঁচবে কি-না জানি না।”

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. রেজা হাসান জানিয়েছেন, আহত ও নিহতদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লাশ নিজ নিজ বাড়িতে নিতে প্রাথমিকভাবে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, “যে দুজন গেটম্যানের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া কুমিল্লার রেলস্টেশন মাস্টারের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
হবিগঞ্জে বাস-পিকআপ সংঘর্ষে নারীসহ নিহত ৪
হবিগঞ্জে বাস-পিকআপ সংঘর্ষে নারীসহ নিহত ৪
কুমিল্লায় ট্রেন দুর্ঘটনা, ৩ তদন্ত কমিটি গঠন
কুমিল্লায় ট্রেন দুর্ঘটনা, ৩ তদন্ত কমিটি গঠন
গুজবে নয়, আলোচনায় সমাধান: মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম
গুজবে নয়, আলোচনায় সমাধান: মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম