উপায়হীন এক পরিবারের গল্প
মুসাব্বির হত্যার পর তিন সন্তান নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী সুরাইয়া বেগম

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা নিহত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বিরের পরিবার। তিন সন্তানের লেখাপড়া আর অসুস্থ শ্বশুরের চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। সম্প্রতি ’ভিওডি বাংলা’ এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্বামী হারানো এই নারী তার পরিবারের বর্তমান দুরবস্থা, স্বামীর রাজনৈতিক ত্যাগ এবং হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিয়ে কথা বলেন।
পুরো পরিবারটাই ভেঙে গেছে
পরিবারের বর্তমান অবস্থার কথা জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সুরাইয়া বেগম। তিনি বলেন, একটা পরিবারের যখন মূল কর্তা থাকে না, তখন ঐ পরিবারটা পুরোপুরি ভেঙে যায়। স্বাভাবিকভাবে ঐ পরিবারটা আর টিকে থাকে না। মুসাব্বিরই আমাদের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিল। আমার তিন ছেলে-মেয়েই পড়াশোনা করে। বড় মেয়েটি অনার্সে পড়ছে, ছোট মেয়েটি এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে এবং ছেলেটি দশম শ্রেণিতে।
ওর বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে-মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াবে। এখন এমন এক অবস্থার মধ্যে পড়েছি, বড় মেয়ের পড়ালেখাও বন্ধ করতে পারব না, আবার চালিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এক টালমাটাল অবস্থায় দিন কাটছে।
পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার শ্বশুর কিডনির পেশেন্ট। সপ্তাহে তাকে তিনটি ডায়ালাইসিস করাতে হয়। একটি পরিবারে এমন ব্যয়বহুল রোগী থাকলে এমনিতেই মাসে বড় অংকের খরচ চলে যায়। বাবার বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়রা খোঁজখবর নিলেও, সব মিলিয়ে আমাদের কোনোমতে দিন পার করতে হচ্ছে।
কর্মীদের নিজের পরিবারের সদস্য মনে করতেন মুসাব্বির
স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে সুরাইয়া বেগম বলেন, ওর কর্মীদের সাথে ওর সম্পর্ক কেমন ছিল, তা মৃত্যুর পর সবাই দেখতে পেয়েছে। কর্মীদের ও সবসময় নিজের পরিবার মনে করত, কখনোই সহকর্মী বলত না। বলত, ‘আমার ছেলেরা, আমার বাচ্চারা’। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাথে যুক্ত থাকলেও বিএনপির অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথেও সে কাজ করত। জেলে থাকা অবস্থায়ও দলের সবাইকে সাহায্য করেছে, এমনকি আমি নিজে ওর উকিল দিয়ে অনেকের জামিনের ব্যবস্থা করিয়েছি।
১৭ বছরের রাজনৈতিক ত্যাগ ও জুলুম
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের কথা স্মরণ করে মুসাব্বিরের স্ত্রী বলেন, বিগত ১৭ বছর সেভাবে ব্যবসাও করতে পারেনি ও। তেজগাঁও এলাকায় যখন কেউ সাহস করে রাজপথে নামেনি, তখন মুসাব্বির নেমেছে। এজন্য ওকে জেল খাটতে হয়েছে, সরকারের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে শেষবার যখন অ্যারেস্ট হয়, তার আগে জেলগেট থেকে ওকে আরও পাঁচবার আটক করা হয়। বের হতে দিত না, সর্বশেষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। তারপরও সে কখনো মাথা নত করেনি, দলের সাথে বেইমানি করেনি।
চাঁদাবাজি বা আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ নাকচ
মুসাব্বিরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা আধিপত্য বিস্তারের কোনো বিষয় ছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে সুরাইয়া বেগম দৃঢ়তার সাথে বলেন, আমি যতটুকু দেখেছি, ও কখনো কারও ক্ষতি করেনি। ২০২০ সালে সে নির্বাচন করেছিল এবং সামনেও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার কথা ছিল। একজন জনপ্রতিনিধি হতে চাওয়া মানুষ কখনোই চাইবে না তার নামে কোনো বদনাম থাকুক। ৫ আগস্টের পর অনেকেই সম্পত্তি দখল বা অনৈতিক কাজ করেছে, কিন্তু মুসাব্বিরকে কখনোই এ ধরনের কাজে লিপ্ত হতে দেখিনি।
মূল আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে’, সুষ্ঠু বিচারের দাবি
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশা ও আশা-দুই-ই প্রকাশ করেন সুরাইয়া বেগম। তিনি বলেন, মুসাব্বির যখন মারা যায়, তখন দেশে একটা নির্বাচনী আবহ ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত থাকায় মামলাটি যেভাবে জোরালো হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। মূল আসামি এখনও দেশের বাইরে, তবে কয়েকজনকে ধরা হয়েছে। মামলাটি এখন ডিবির কাছে আছে। আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে সবকিছু করতে পারে। আমার দাবি, দেশের বাইরে থাকা আসামিদের ধরে এনে সঠিক বিচার করা হোক।
সবশেষে দল এবং সরকারের কাছে আকুতি জানিয়ে সুরাইয়া বেগম বলেন, তৃণমূল থেকে বিএনপি করা মুসাব্বির দলের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমরা পরিবার হিসেবে অনেক সাফার করেছি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বর্তমান সরকারের কাছে আমার বিনীত আবেদন-মুসাব্বির হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হোক। দলের জন্য তার যে ত্যাগ, তার সঠিক মূল্যায়ন করে আমার এই অসহায় পরিবারের পাশে যেন তারা দাঁড়ান।
ভিওডি বাংলা/ইসমাইল হোসেন/আ







