১৫ বছরে দেশে যা হয়েছে তা নির্বাচন নয়: ড. তোফায়েল

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ভালো নির্বাচন অনেক সমস্যার সমাধান নিয়ে আসবে। ভালো নির্বাচন জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে হতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তিটা নিচে। সেই ভিত্তির ওপর জাতীয় গণতন্ত্র নির্ভর করে। স্থানীয় নির্বাচন ভালো হলে জাতীয় নির্বাচন ধীরে ধীরে ভালো হবে। এখন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ কোনোটিই নেই। আমরা শূন্যতার মধ্যে আছি।
মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারী) দুপুরে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় স্থানীয় সরকার সংস্কার বিষয়ক মতবিনিময় সভা প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন ও উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, গত ১৫ বছরে দেশে যে নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো কোনো নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনকে দেখে কেউ যদি কল্পনা করেন তাহলে কিন্তু তা অন্য জিনিস হয়ে যাবে। আমরা চুন খেয়ে আসছি, এখন দই দেখলে ভয় পাই। সুতরাং একটি ভালো নির্বাচন করতে চিন্তা করতে হবে। আর এজন্য সবার দায়িত্ব আছে। ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভোটারেরও দায়িত্ব আছে। ভোটারদের দায়িত্ব হচ্ছে একজন শিক্ষিত ও ভালো মানুষকে নির্বাচনে দাঁড়াতে সাহায্য করা, প্রচার-প্রচারণায় সাহায্য করা এবং ভোট দেওয়া।
তিনি বলেন, ভালো প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশ নিতে সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ নির্বাচনের খরচ এবং পেশি শক্তির প্রভাব। কিন্তু এগুলো সহজে মুক্ত করার উপায় নেই। কারণ হচ্ছে, সমাজ-সংস্কৃতি এগুলোকে পছন্দ করছে, চাঁদাবাজিকে প্রচ্ছন্নভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে সবারই ভূমিকা আছে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছেন। আরও কয়েক হাজার মানুষ আহত, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। যে দেশে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বায়তুল মোকাররমের খতিব পালিয়ে যান, চেয়ারম্যান-মেম্বার পালিয়ে যান, এটা কোন দেশ! আপনি, আমি সেই দেশের বাসিন্দা। আমরা কোন দেশে দাঁড়িয়ে আছি তা বুঝতে হবে। পৃথিবীর বহু দেশে স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, কিন্তু এভাবে সব অংশে পালিয়ে যাওয়ার নজির নেই।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের এক রকম নির্বাচন হয়। একজন চেয়ারম্যান ও ১২ জন সদস্য হয়; কিন্তু উপজেলার সঙ্গে ইউনিয়নের মিল নেই। উপজেলা নির্বাচনে ওয়ার্ড নেই, ওয়ার্ডভিত্তিক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয় না। একজন চেয়ারম্যান এবং দুজন ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিন জনই কেউ কারো কম নয় বলে নিজেরা ভাবেন। আবার জেলা পরিষদ নির্বাচন আরও ভিন্ন। সেখানে খালুরা, মামুরা মিলে ভোট করেন। পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে জেলা পরিষদে বয়স্ক নেতাদের চেয়ারম্যান হিসেবে বসিয়ে রাখা হয়। ১২ জন সদস্য ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে অফিস করেন আর অফিসে হেঁটে যাওয়ার মতো চেয়ারম্যানের শক্তি নেই। এগুলো কী কোনো সিস্টেম হলো! এটাকে একটা সিস্টেমে আনার জন্য দেশের সবাইকে চিন্তা করতে হবে।
উপজেলা পরিষদ এবং উপজেলা প্রশাসন- দুটি আলাদা সত্তা নয়। উপজেলা পরিষদ যখন থাকে আইনকানুন যা আছে উপজেলা প্রশাসনের বড় একটি অংশ (৭০ থেকে ৮০ ভাগ অংশ) উপজেলা পরিষদের অন্তর্গত। সুতরাং উপজেলা পরিষদ প্রশাসন বলাটাই শ্রেয়। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দুটি সত্তা রয়েছে। একটি হলো তিনি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসকের কাছে দায়বদ্ধ এবং অপরটি হচ্ছে পরিষদের ওপর ন্যস্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা পরিষদের ১৭টি কার্যক্রম তার মাধ্যমে হবে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক মানোয়ার হোসেন মোল্লা। এ সময় স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ফেরদৌস আরফিনা ওসমান, আবুদর রহমান, মাহফুজ কবীর, মাশহুদা খাতুন শেফালী, মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, ইলিরা দেওয়ান, কাজী মারুফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ আবদুল ওয়ারেস, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান সোহাগ, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবিদুর রহমান খান, সিংগাইর পৌরসভার সাবেক মেয়র খোরশেদ আলম ভুইঁয়া উপস্থিত ছিলেন।
সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা, পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর এবং উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যানরা প্রশ্ন করেন এবং মতামত দেন।







