• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

বিশ্বকাপে অর্থনীতির খেলায় কারা জিতল, কারা হারল?

ভিওডি বাংলা ডেস্ক    ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৯ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মাঠের লড়াইয়ে বিশ্বকাপ মানেই গোল, নাটকীয়তা আর চ্যাম্পিয়নের গল্প। কিন্তু মাঠের বাইরেও চলে আরেকটি বিশাল প্রতিযোগিতা—অর্থনীতির। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসরে পরিণত হয়েছে। ৪৮টি দলের অংশগ্রহণ এবং ১০০টির বেশি ম্যাচের কারণে দর্শকসংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আয়-রোজগারের সুযোগও।

তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবাই সমানভাবে লাভবান হয়নি। কেউ পেয়েছে রেকর্ড আয়, আবার কেউ হয়েছে বড় ক্ষতির মুখোমুখি।

সবচেয়ে বড় বিজয়ী ফিফা

বিশ্বকাপ থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে ফুটবলের বিশ্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় হয়েছিল রেকর্ড ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় আয়োজিত ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে।

ডয়েচে ব্যাংক রিসার্চের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ মারিয়ন লাবোরের মতে, চার বছরের চক্রে ফিফার মোট রাজস্ব প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ফিফার আয়ের প্রধান উৎস সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি, স্পন্সরশিপ, লাইসেন্সিং, আতিথেয়তা (হসপিটালিটি), টিকিট বিক্রি এবং এখন সরকারি পুনর্বিক্রয় (রিসেল) প্ল্যাটফর্মও। সেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ করে কমিশন নিচ্ছে ফিফা।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে যদি বিশ্বকাপ ৬৪ দলে সম্প্রসারণ করা হয়, তাহলে চীন ও ভারতের মতো বিশাল বাজার যুক্ত হওয়ায় ফিফার আয় আরও বাড়বে।

দর্শকদের পকেটে বড় চাপ

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের একজন সাধারণ দর্শক।

বিশেষ করে টিকিটের উচ্চমূল্য এবং ফিফার ডায়নামিক প্রাইসিং নীতির কারণে অনেক সমর্থক ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এই ব্যবস্থায় চাহিদা বাড়লে টিকিটের দামও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নিজের দেশের উদ্বোধনী ম্যাচের এক হাজার ডলারের টিকিট তিনি কিনতেন না।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের অফিসিয়াল টিকিটের সর্বোচ্চ মূল্য ছিল প্রায় ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার। পুনর্বিক্রয় বাজারে কিছু টিকিটের দাম ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

শুধু টিকিট নয়, বিমানভাড়া, হোটেল, খাবার এবং স্থানীয় যাতায়াতেও দর্শকদের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।

বিশেষ আলোচনায় আসে নিউ জার্সি ট্রানজিটের ট্রেন ভাড়া। সাধারণ সময়ে ৩০ মিনিটের যাত্রার ভাড়া যেখানে ছিল ১২ দশমিক ৯০ ডলার, বিশ্বকাপ চলাকালে তা বেড়ে ১৫০ ডলারে পৌঁছায়। পরে সমালোচনার মুখে ভাড়া কিছুটা কমানো হলেও তা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সরদের বড় আয়

বিশ্বকাপ সম্প্রচার করতে টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। তবে বিজ্ঞাপন বিক্রি থেকে সেই বিনিয়োগের বড় অংশই উঠে আসছে।

এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নিয়মিত হাইড্রেশন ব্রেক বা পানি পানের বিরতি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স স্পোর্টস, যারা সম্প্রচার স্বত্বের জন্য প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে, সেই বিরতিগুলো স্পন্সর ব্র্যান্ডের নামে সম্প্রচার করেছে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ফক্সে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিশ্বকাপ বিজ্ঞাপনের মূল্য ছিল দুই থেকে তিন লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচগুলোতে তা বেড়ে সাড়ে সাত লাখ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।

ধারণা করা হচ্ছে, শুধু হাইড্রেশন ব্রেকের বিজ্ঞাপন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে।

স্পন্সরদেরও লাভ

বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পন্সর হিসেবে অ্যাডিডাস, কোকা-কোলাসহ বড় বড় ব্র্যান্ড কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

অ্যাডিডাসের প্রচারণায় লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহাম, লিওনেল মেসি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ডেভিড বেকহামের উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

তবে কিছু আনুষ্ঠানিক স্পন্সর নয় এমন ব্র্যান্ডও আলোচনায় আসে। যেমন, সান ফ্রান্সিসকোর লেভিস স্টেডিয়ামের বাইরে থাকা 'লেভিস' লোগো ঢেকে দেওয়ায় উল্টো ব্র্যান্ডটি আরও বেশি প্রচার পায়।

ডেভিড বেকহামের বাণিজ্যিক সাফল্য

অবসর নেওয়ার এক দশকেরও বেশি সময় পরও ডেভিড বেকহাম বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক মুখ।

বিশ্বকাপ চলাকালে তিনি হোম ডিপো, ব্যাংক অব আমেরিকাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে ছিলেন।

তার সহ-মালিকানাধীন ক্লাব ইন্টার মায়ামি বর্তমানে মেজর লিগ সকারের সবচেয়ে মূল্যবান ক্লাব, যার আনুমানিক মূল্য ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

মাঠে বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও বাণিজ্যিক দিক থেকে বেকহামকে বড় বিজয়ী বলছেন বিশ্লেষকেরা।

আয়োজক শহরগুলোর লাভ কি সত্যিই হয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি আয়োজক শহরে লাখো পর্যটক এলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক লাভ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ফিফার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বকাপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার যোগ করবে, যার মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই যুক্ত হবে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হয়েছে।

তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলেকজান্ডার বাডজিয়ারের মতে, বড় ক্রীড়া আয়োজন দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনে—এমন প্রমাণ খুবই সীমিত।

তার ভাষায়, বিশ্বকাপ চলাকালে অনেক সাধারণ পর্যটক ভিড় এড়িয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে অনেক শহরে প্রত্যাশিত পর্যটকও আসে না।

তিনি বলেন, "এ ধরনের আয়োজন চাকরি সৃষ্টি করে, কিন্তু সম্পদ সৃষ্টি করে না।"

প্রত্যাশা পূরণ হয়নি হোটেল খাতে

হোটেল শিল্পও প্রত্যাশিত লাভ করতে পারেনি।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ভ্যাঙ্কুভারে সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলেও জুন ও জুলাই মাসে বুকিং গত বছরের তুলনায় কম ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল মালিকদের সংগঠন অভিযোগ করেছে, ফিফা নিজেদের ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত কক্ষ আগেই বুক করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেছিল। যদিও ফিফা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।

বাজির বাজারে রেকর্ড

২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া জুয়ার আসর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ম্যাককোয়ারি ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের হিসাব অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্টে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজি ধরা হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বাজি।

ফ্লাটার এন্টারটেইনমেন্ট, যারা প্যাডি পাওয়ার, বেটফেয়ার ও স্কাই বেট পরিচালনা করে, জানিয়েছে বিশ্বকাপকে ঘিরে বাজির পরিমাণ ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন ম্যাচ শুরুর আগে নয়, খেলা চলাকালীন মুহূর্তে বাজি ধরার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

অর্থনীতির বিশ্বকাপে কারা এগিয়ে?

সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের নয়, অর্থনীতিরও এক বিশাল মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ফিফা, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, স্পন্সর ও বেটিং কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হলেও দর্শক, হোটেল ব্যবসার একটি অংশ এবং আয়োজক শহরগুলোর অনেক প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

মাঠে কে চ্যাম্পিয়ন হবে, তা নির্ধারণ হয় ৯০ মিনিটে। কিন্তু বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক লড়াইয়ে বিজয়ী ও পরাজিতদের গল্প আরও দীর্ঘ এবং অনেক বেশি জটিল।

সূত্র: বিবিসি

ভিওডি বাংলা/আরআর/আ


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
কিংবদন্তি স্যার গারফিল্ড সোবার্স। ছবি: সংগৃহীত
কিংবদন্তি স্যার গারফিল্ড সোবার্স আর নেই, শোকস্তব্ধ ক্রিকেট বিশ্ব
ছবি: সংগৃহীত
আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে স্পেনকে ‘মাথা ঠান্ডা’ রাখার বার্তা কোচের
ফাইনালে চিরচেনা জার্সিতেই লড়বে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ছবি: সংগৃহীত
ফাইনালে চিরচেনা জার্সিতেই লড়বে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা