রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ডুবুরি সাদিক শুভর দাফন সম্পন্ন

রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিসের দক্ষ ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভকে (২৬) অশ্রুসিক্ত পরিবেশে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসংখ্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া এই সাহসী সদস্যের অকাল মৃত্যুতে পরিবার, সহকর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার কুমড়াকান্দি গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নিজ গ্রামের বাড়িতে শুভর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, জনপ্রতিনিধি, ক্রীড়াঙ্গনের ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে জুমার নামাজের পর ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রধান কার্যালয়ে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সহকর্মীরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় দেওয়া হয়।
দাফনের আগে রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দ ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে শুভর প্রতি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দীর্ঘদিন একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সহকর্মীদের অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। উদ্ধার অভিযানে সাহসিকতার জন্য পরিচিত এই সদস্যকে হারিয়ে তারা গভীর শোক প্রকাশ করেন।
পারিবারিক সূত্র ও ফায়ার সার্ভিস জানায়, সাদিক হোসেন শুভ নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনে প্রশিক্ষিত ডুবুরি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর ফায়ার ঘাটসংলগ্ন একটি জেটির সামনে কচুরিপানা অপসারণের কাজে অংশ নেন তিনি।
এ সময় স্পিডবোটের ধাক্কা অথবা সৃষ্ট ঢেউয়ের কারণে ভারসাম্য হারিয়ে তিনি নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল তাৎক্ষণিক অভিযান শুরু করে। প্রায় আট ঘণ্টার টানা অনুসন্ধানের পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মাত্র দুই বছর আগে সংসার শুরু করেছিলেন শুভ। তার আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না পরিবার।
ছেলের রাষ্ট্রীয় পদক বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা। তিনি বলেন, মৃত্যুর আগের দিনও ছেলে বাবার কাছে পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিল। কয়েক দিন আগে ফোনে কথা হয়েছিল। সামনের সপ্তাহে বাড়ি আসার কথা জানিয়েছিল। সেই ছেলেই আর ফিরল না। তিনি সন্তানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
শুভর চাচা ও গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. ফজলুল হক বলেন, সাদিক ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ডুবুরি। এমন একজন মানুষের নদীতে ডুবে মৃত্যু স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া কঠিন। তিনি বলেন, ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন।
সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি ফুটবল অঙ্গনেও পরিচিত ছিলেন সাদিক হোসেন শুভ। গোয়ালন্দ এলাকার বিভিন্ন ক্লাব ও একাডেমির হয়ে দীর্ঘদিন গোলরক্ষক হিসেবে খেলেছেন তিনি। মাঠে তার পারফরম্যান্স এবং ব্যক্তিগত আচরণ তাকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
গোয়ালন্দ ফুটবল একাডেমির চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, শুভ একজন মেধাবী গোলরক্ষক ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তিনি দলের নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঠের বাইরেও তিনি ছিলেন বিনয়ী, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ। তার মৃত্যু স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের জন্য বড় ক্ষতি।
গোয়ালন্দ পৌরসভার কুমড়াকান্দি গ্রামের আশরাফ আলী শেখের মেজ ছেলে সাদিক হোসেন শুভ। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ফায়ার সার্ভিসে দায়িত্ব পালনকালে সাহসিকতা, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সম্মানজনক ‘রাষ্ট্রীয় ফায়ার সার্ভিস পদক’ লাভ করেন।
ভিওডি বাংলা/জা








মন্তব্য