জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দল বিভ্রান্ত করছে: মির্জা ফখরুল

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকারই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। এ নিয়ে বিরোধী দল জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমেদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় এসব কথা বলেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা আজকে অনেকগুলো কথা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের বিরোধীদল থেকে বলা হচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সংসদে আদায় না হলে রাজপথের ফয়সালা হবে। আমার কাছে মনে হয়, জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য এই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। জুলাই সনদ আমরা স্বাক্ষর করেছি একসাথে। যে সমস্ত দল আমরা আন্দোলন করেছি একসাথেই তারা সবাই স্বাক্ষর করেছি। জুলাই সনদে প্রতিটি অক্ষর আমরা বারবার করে বলছি যে আমরাই বাস্তবায়িত করব। এটাতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে, সেই গণভোটের একটা অংশে তো আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাই হয়নি। আমরা বারবার করে যে কথা বলতে চাচ্ছি যে, আমরা উচ্চকক্ষে অনুপাতিক হারে ভোটে যে প্রতিনিধিত্ব হবে সেই বিষয়টাতে আমরা কখনোই একমত হইনি। সে সময়ে স্টেটমেন্ট দিয়েছিলাম আমি নিজেই যে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। সেই সংস্কার কমিশন-রিফর্ম কমিশন তারা যে কথাগুলো সেদিন যেভাবে নিয়ে এসেছেন আমাদের কনসেন্ট ছাড়া তারা নিয়ে আসছেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, জুলাই সনদের বইটা যদি আপনারা পড়েন সেখানে প্রতিটি জায়গায় বলা আছে যে, যে দল নির্বাচিত হবে তারা তাদের ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী সেটাকে বাস্তবায়িত করবে। আমরা বারবারই এই কথা বলে এসেছি এবং উই আর কমিটেড। আমরা ৩১ দফাতে যেমন কমিটেড ঠিক তেমনিভাবে আমরা কমিটেড হচ্ছি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে। কিন্তু সেটা আমরা যেভাবে চেয়েছি সেভাবে আমরা বলছি। এখানে বিরোধী দল সম্পূর্ণভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে যে, আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাই না।
বৃহস্পতিবার কাকরাইলের আইইবি ভবন মিলনায়তনে জুলাই সনদ দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছিলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সংসদে আদায় না হলে রাজপথে ফয়সালা হবে। গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংবিধানে সংশোধনের নামে কোনো ভাঁওতাবাজি জনগণ মেনে নেবে না।”
‘সংস্কার বিএনপিই এনেছে’
সংস্কার প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, সংস্কারের কথা বলে। সংস্কার এদেশে কারা এনেছে? বিএনপি এনেছে। একদলের শাসন ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিএনপি নিয়ে এসেছে, প্রেসিডেনশিয়াল ফর্ম অব গভর্নমেন্ট থেকে পার্লামেন্টারি ফর্ম অব গভর্নমেন্ট বিএনপি নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান সেই বিধান আমরাই পার্লামেন্টে সারারাত কাজ করে আমরা পাশ করেছি। আজকে যখন এ সমস্ত কথাগুলো বলা হয় জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য বলা হয় বলে আমি মনে করি।
বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এখন বিরোধী যারা আছেন তারা অনেকে বিভিন্ন রকম মুখরোচক কথা বলে জনগণকে উত্তেজিত করবার চেষ্টা করছেন।
তার ভাষায়, জনগণের চেয়ে ভালো তো আর কেউ বোঝে না। আমরা যতই মনে করি, জনগণ কিন্তু সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তারাই সেই সিদ্ধান্তটা সবচেয়ে ভালো নেবেন যে আমরা সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে কী বলেছি।
‘আমরা সংবিধান সংস্কার নয়, সংশোধন চাই’
সংবিধান নিয়ে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, এখন যে কথাগুলো নিয়ে তাদের কথা... সংবিধান সংস্কার আর সংবিধান সংশোধন। আমরা তো বরাবরই বলে এসেছি যে, আমরা সংবিধান সংশোধন করতে চাই। আমরা সংবিধান সংস্কারের কথা কখনোই বলিনি।
তিনি বলেন, জনগণ আমাদেরকে যে ভোট দিয়েছে, ম্যানিফেস্টোর মধ্যে যেটা ছিল সেই ম্যানিফেস্টোতে আমরা টু থার্ড মেজরিটি নিয়ে বিএনপি আজকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সুতরাং ওই জায়গায় কোনো রকমের কোনো বিভ্রান্তির অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।
‘ক্ষমতায় যেতে জুলাই সনদকে ব্যবহার করতে চায়’
বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমি মনে করি যে, বিরোধী দল শুধুমাত্র তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এই জুলাইকে (জুলাই সনদ) তারা ব্যবহার করতে চায়। আমরা কিন্তু চাই না যে জুলাই শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আরেকটা হাতিয়ারে পরিণত হোক।
তিনি বলেন, আমরা যেটা বারবার করে বলে আসছি, যে জুলাইয়ের আন্দোলন শুধু ওই জুলাই মাসের আন্দোলন নয়। জুলাইয়ের আন্দোলন কিন্তু আমরা দীর্ঘকাল ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৮/১৯ বছর ধরে যে লড়াই হয়েছে সে লড়াইয়ের ফলশ্রুতি হচ্ছে আমাদের এই ’২৪-এর জুলাইয়ের আন্দোলন। সেই ফলশ্রুতিতে আমরা সেভাবে এসেছি।
‘জুলাই আন্দোলনে বিএনপিই সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছে’
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলেন। বিএনপির ৬০ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে, বিএনপির প্রায় ১৭ শ নেতাকর্মী গুম হয়ে গেছে। বিএনপির কয়েক হাজার মানুষ হত্যা হয়েছে এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে।
তিনি বলেন, সুতরাং এই কথাগুলো বারবার করে আমাদেরকে বলতে হয় এজন্য যে, অনেকে এটাকে নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন।
গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা লিবারাল ডেমোক্রেসির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছি, সেই লিবারাল ডেমোক্রেসির পক্ষে আমরা যেতে চাই। আমার প্রায় একটা কথা মনে হয় যে, আমরা এখান থেকে সরে যেতে চাই কেন? ডেমোক্রেসি থাকতে আমাদের প্রবলেমটা কোথায়?
তিনি আরও বলেন, আমরা ডেমোক্রেসিতে থাকি। বিভাজনের রাজনীতি না করি। আমরা সবাই মিলে যেভাবে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, যুদ্ধ করেছিলাম, আমরা স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আবার ’২৪-এ আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই করে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছি। এখন একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সবাই মিলে আমরা এটাকে যদি সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারি যেখানে আমাদের সেই লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাতে পারব।
সমস্যার সমাধান সহজ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যার সমাধান এতো সহজ নয়, অত্যন্ত জটিল। এত সহজেই এতগুলো ক্লে চলে যাবে না, এত সহজেই আমরা মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত কিছুকে সুন্দর করে ফেলতে পারবো না।
তিনি বলেন, কিন্তু ধৈর্যের মধ্যে ধরে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। আজকে প্রফেসর এমাজ উদ্দিন আহমেদ সাহেবের আমরা বারবার সেই কথাই মনে করি যে, তার দেখানো পথ... তিনি যে পথে চলতে চেয়েছেন গণতন্ত্রের পথে, তিনি লিবারাল ডেমোক্রেসির পথে এবং সকলকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে সত্যিকার একটা ডেমোক্রেটিক কান্ট্রি গড়ে তোলার ব্যাপারে সেদিকে আমরা এগিয়ে যাব।
স্মরণসভায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ এমন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি উপাচার্য হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করেছিলেন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি একটি পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক দর্শনের চর্চা করে গেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ১৯৭০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে একসঙ্গে পথচলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, কৃতি গবেষক ও অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ। শিক্ষার্থীদের তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন।
স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন এমাজ উদ্দিন আহমেদ রিসার্চ সেন্টারের আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুদ, যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, আবুল কাশেম হায়দার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার, এম আবদুল্লাহ, অধ্যাপক ওমর ফারুক, অধ্যাপক শেখ সাদী ও কবি নাহিদ নজরুল।
অনুষ্ঠানের শেষে অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমেদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
ভিওডি বাংলা/এএইচ/এফএ








মন্তব্য