• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

ট্রাম্পকে হত্যার স্লোগানে উত্তাল তেহরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক    ৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৫ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজাকে ঘিরে তেহরানে তৈরি হয়েছে গভীর শোক, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আবহ। রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ প্রাঙ্গণে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই জানাজায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যার আহ্বানও উচ্চারিত হয়েছে।

রোববার তেহরানে আয়োজিত এই রাষ্ট্রীয় জানাজায় অংশ নেওয়া জনতার হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা। বহু মানুষ আগের রাত থেকেই মসজিদ এলাকায় অবস্থান নেন। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গ্র্যান্ড মোসাল্লা ভোর হওয়ার আগেই পূর্ণ হয়ে যায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এতদিন তাঁর দাফন বিলম্বিত ছিল। বর্তমানে ইরানজুড়ে সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।

জানাজার মূল নামাজে ইমামতি করেন কোম শহরের ৯৭ বছর বয়সী প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। শুধু খামেনি নন, তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যের জানাজাও অনুষ্ঠিত হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানি। ছোট্ট নাতনির কফিন পুরো অনুষ্ঠানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে।

জানাজা শুরুর আগে কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে কবি মোহাম্মদ রাসুলি বলেন, “এখন থেকে কাফনের কাপড়ই আমাদের পোশাক। আপনার রক্তের কসম, ট্রাম্পকে হত্যা করা এখন আমাদের দায়িত্ব।”

তিনি আরও বলেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত মানুষটি এখনো কেন বেঁচে আছেন? ট্রাম্পের জন্য পৃথিবী আর নিরাপদ জায়গা নয়। যে ব্যক্তি আমাদের ইমামকে হত্যা করেছেন, আমরা কেন তাঁকে হত্যা করব না? তা না করা আমাদের জন্য কলঙ্কের।”

এই বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতার বড় একটি অংশ করতালির মাধ্যমে সমর্থন জানায়। কফিনের পাশে রাখা বিভিন্ন বার্তার মধ্যেও ইংরেজিতে লেখা ছিল, “Kill Trump”।

জানাজাস্থলের চারপাশের সড়ক মোজতবা খামেনি ও তাঁর বাবার ছবি দিয়ে সাজানো হয়। বিভিন্ন স্টলে মোজতবার বক্তব্যসংবলিত বই বিতরণ করেন আলেমরা। যদিও নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিন মাস ধরে মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসেননি। রোববারের জানাজাতেও তাঁকে দেখা যায়নি। তবে তাঁর ভাই মুস্তফা, মাসুদ ও মেসাম কফিনের পাশে উপস্থিত ছিলেন।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর বলেন, “জনগণ তাঁদের নেতাকে বিদায় জানাতে দুটি স্লোগান দিচ্ছেন, শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ইরানের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।”

জানাজায় দেশটির রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। আল-কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি এবং আইআরজিসি কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদিকেও প্রকাশ্যে দেখা যায়। যুদ্ধের শুরুর সময় যেটি কল্পনা করাও কঠিন ছিল।

আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত খলিল শিরঘোলামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “আপনি মানুষকে হত্যা করতে পারবেন, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নয়। আপনারা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করেছেন সত্যি, তবে প্রকৃতপক্ষে আপনারা একটি সুগন্ধির বোতল ভেঙেছেন, যার সুবাস এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আপনাদের কোনো সভ্যতা নেই, ইতিহাস নেই, কোনো সম্মান নেই। তাই আপনারা কখনোই এটি উপলব্ধি করতে পারবেন না।”

৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তীব্র গরম উপেক্ষা করেও হাজারো মানুষ লাল পতাকা হাতে জানাজায় অংশ নেন। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত স্লোগান ছিল, “কোনো আপস নয়, কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কেবলই প্রতিশোধ।”

মধ্যরাতের পরও তেহরানের প্রধান প্রধান সড়ক ও চত্বরে শোকমিছিল অব্যাহত ছিল। অনেকেই জানিয়েছেন, সীমিত আয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন। কেউ কেউ স্কুল, তেল কোম্পানির কার্যালয় কিংবা অস্থায়ী ডরমিটরিতে তিন দিন ধরে অবস্থান করছেন।

বোয়ের-আহমাদ থেকে আসা লায়লা আহমাদি বলেন, “প্রয়োজনে আমরা লাঠিসোঁটা ও কোদাল দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করব।”

৭০ বছর বয়সী বই অনুবাদক হোসেন দেহঘান বলেন, “আমাদের নেতাকে সন্ত্রাসী কায়দায় হত্যার পর মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও শোক জন্ম নিয়েছে। এই সমাবেশগুলো মূলত পারস্পরিক সংহতি প্রকাশ এবং তথ্য আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম।”

তিনি আরও বলেন, “আমি জানি, পশ্চিমা বিশ্ব তাঁকে একনায়ক বলে ডাকত এবং তিনি সব ইরানির কাছে জনপ্রিয় ছিলেন না ঠিকই, তবে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল।”

তেহরানের বাসিন্দা ইব্রাহিম কালিম বলেন, “একটি ইসরায়েলি বোমার আঘাত থেকে আমি অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আমি আজ জীবিত।”

তিনি আরও বলেন, “রাতে মাত্র কয়েক মাইল দূরে ২০টিরও বেশি বোমা পড়ার শব্দ গোনার অভিজ্ঞতা কেমন, তা আপনারা বুঝবেন না। আকাশ দিয়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখার অনুভূতি একাধারে ভীতিকর ও অপমানজনক।”

অনানুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, জানাজার প্রথম দিনেই ২০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচির অংশ হিসেবে সোমবার তেহরানে বড় শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর খামেনির মরদেহ কোম, ইরাকের দুটি পবিত্র শহর এবং সবশেষে তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে নেওয়া হবে দাফনের জন্য।

ভিওডি বাংলা/এমএস 


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: সংগৃহীত
যৌথ সামরিক মহড়ায় নামছে চীন ও রাশিয়া
ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলের কারাগার থেকে ছাড়া পেলেন ৯ ফিলিস্তিনি
সৌদি আরবে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ছবি: সংগৃহীত
১২ হাজার অভিবাসীকে ফেরত পাঠালো সৌদি আরব