৪৭তম বিসিএসে যোগ্য প্রার্থী সংকট, শূন্য ২ হাজার ক্যাডার পদ

৪৭তম বিসিএসে যোগ্য প্রার্থীর চরম অভাব দেখা দিয়ছে। দুই হাজার ক্যাডার পদ শূন্য রয়েছে। আবেদনকারীদের মধ্যে চূড়ান্তভাবে ক্যাডার পদে উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ প্রার্থী। অর্থাৎ, প্রতি এক হাজার আবেদনকারীর বিপরীতে গড়ে মাত্র তিনজন প্রার্থী ক্যাডার হওয়ার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পেরেছেন।
চাকরিপ্রার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের ঘাটতি সামনে এসেছে। পৌনে চার লাখ পরীক্ষার্থী আবেদন করলেও পিএসসির নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতা বা পাস নম্বর তুলতে না পারায় মূল বিজ্ঞপ্তির অর্ধেকের বেশি ক্যাডার পদ ফাঁকা রেখেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করতে হয়েছে।
গত রোববার (২৮ জুন) বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ৪৭তম বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারে ১ হাজার ৩২০ জন এবং নন-ক্যাডারে ২০১ জনসহ সর্বমোট ১ হাজার ৫২১ জনকে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ এই বিসিএসের মূল বিজ্ঞপ্তিতে মোট ক্যাডার পদ ছিল ৩ হাজার ৪৮৭টি। ফলে পদের বিপরীতে ২ হাজার ১৬৭টি ক্যাডার পদ ফাঁকা রয়ে গেছে। পিএসসি জানিয়েছে, মূলত কারিগরি ও বিশেষায়িত (টেকনিক্যাল) ক্যাডারগুলোতে (শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রকৌশল) প্রার্থীরা প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা পার করে এলেও চূড়ান্ত মূল্যায়নে পিএসসির নির্ধারিত ন্যূনতম পাস নম্বরই তুলতে পারেননি।
বিসিএসের মতো সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এমন বিপুলসংখ্যক বিশেষায়িত পদ খালি থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিসিএসের মতো জায়গায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না, এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এ পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাঁরা কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করছেন, তাঁদের বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখতে হবে। আমাদের কারিকুলামে কোনো ধরনের ফাঁক বা গ্যাপ থাকছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি আমরা গ্র্যাজুয়েটদের প্রকৃত অর্থে মানসম্মত বা কোয়ালিটি এডুকেশন দিতে পারছি কি না, তা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।’
এদিকে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাকরিপ্রার্থী জানান, সাবজেক্টিভ বা কারিগরি বিষয়ে পাস করা প্রার্থী না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এবার বাংলায় প্রভাষক পদের প্রায় সবগুলোই খালি রয়ে গেছে, আর অন্য বিষয়ের প্রার্থীদের তো বাংলায় সুপারিশ করার সুযোগ নেই।
অন্য কয়েকজন প্রার্থীর মতে, ৪৫তম বিসিএস পর্যন্ত টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর প্রশ্ন মূলত মৌলিক বা বেসিক পর্যায় থেকে করা হতো। ফলে প্রার্থীরা সাধারণ ক্যাডারের পাশাপাশি কারিগরি বিষয়ের পড়াশোনা করে সহজেই পাস করে যেতেন। কিন্তু ৪৬তম বিসিএস থেকে টেকনিক্যাল বিষয়ের প্রশ্ন অনেক গভীর ও কঠিন করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর লিখিত পরীক্ষার জন্য যে সময় দেওয়া হচ্ছে, সেই অল্প সময়ে সাধারণ ক্যাডার ও টেকনিক্যাল বিষয়ের বিশাল সিলেবাস একসঙ্গে শেষ করা প্রার্থীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে প্রার্থীরা সাধারণ ক্যাডারের প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় টেকনিক্যাল বিষয়ে পাসই করতে পারছেন না, যার খেসারত দিতে হচ্ছে পদ খালি রেখে। আগামী ৫০তম বিসিএসে প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষার মাঝখানের সময় মাত্র ৫৮ দিন নির্ধারণ করায় প্রার্থীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এত কম সময়ে দুই দিকেই সমানভাবে পারদর্শী হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বিজ্ঞপ্তির অর্ধেকের বেশি পদ ফাঁকা থাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম স্পষ্ট ভাষায় জানান, বর্তমানে মুখস্থনির্ভর ও গতানুগতিক প্রশ্নের পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী, যুক্তিনির্ভর এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক প্রশ্নের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের প্রশ্নের উদ্দেশ্য হলো প্রার্থীদের কেবল তথ্য মুখস্থ করার সক্ষমতা নয়, বরং তাদের অনুধাবন, বিশ্লেষণ, যুক্তি প্রয়োগ এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগের দক্ষতা মূল্যায়ন করা। নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে অনেক পরীক্ষার্থী এখনো পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। এ ছাড়া পরীক্ষকদের মূল্যায়ন থেকে প্রতীয়মান হয়েছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরীক্ষার্থী প্রশ্নের মূল বক্তব্য ও চাহিদা যথাযথভাবে অনুধাবন না করেই উত্তর লিখছেন। ফলে তাঁদের অনেক উত্তর প্রশ্নের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক থাকে না এবং কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে পারে না। তাই ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীর অনুধাবন, প্রশ্নের চাহিদা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ এবং প্রাসঙ্গিক ও সুসংগঠিত উত্তর লেখার দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
পদের বিপরীতে প্রার্থীর অভাব ছিল না, অভাব ছিল কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতার। চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিসিএস হচ্ছে দেশের মেধা যাচাইয়ের সর্বোচ্চ স্তর। কারিগরি ও বিশেষায়িত ক্যাডারে যে ধরনের যোগ্যতার প্রয়োজন, প্রার্থীরা পরীক্ষায় সেই ন্যূনতম মানদণ্ড বা নির্ধারিত পাস নম্বর তুলতে পারেননি। পদ খালি গেছে বলে আমরা পাস নম্বর কমিয়ে কম যোগ্য কাউকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করতে পারি না। পিএসসি সরকারি কর্মক্ষেত্রের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। মেধার মূল্যায়নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।’
অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম আরও জানান, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ফল প্রকাশের কথা ভাবা হলেও চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা বিবেচনা করে কারিগরি ও প্রশাসনিক কাজ দ্রুত শেষ করে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ৪৭তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বেশ দ্রুততার সঙ্গেই সব পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিল পিএসসি। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের অপেক্ষার অবসান ঘটলেও বিশেষায়িত পদের এই বিপুল শূন্যতা দেশের উচ্চশিক্ষার মান, প্রশ্নপদ্ধতি এবং কর্মমুখী যোগ্যতার ঘাটতিকে নতুন এক জাতীয় বিতর্কের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
ভিওডি বাংলা/আরআই/এমএস








মন্তব্য