• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

চলতি বছরের অর্থবিল জাতীয় সংসদে পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক    ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:২৪ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘অর্থবিল-২০২৬’। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন নম্বরের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়াসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী যুক্ত করে বিলটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি চূড়ান্তভাবে পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে সংসদ বিলটি অনুমোদন দেয়।

বিলটি সংসদে তোলার পর সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়। জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবও তোলা হয় কয়েকজন সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে। আলোচনায় বড় ঘাটতির বাজেট, বাড়তি কর ও ভ্যাটের চাপ, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বৈদেশিক ঋণের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্যরা।

বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ কয়েকজন সদস্য সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আরও গভীরভাবে যাচাইয়ের আহ্বান জানান। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো।

তবে দীর্ঘ আলোচনার পর সংশোধনী সংযোজন করে অর্থবিলটি পাস করা হয়।

পাস হওয়া অর্থবিলে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হচ্ছে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বাতিল করা। অতীতে বিভিন্ন সময় সরকার বিশেষ শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলেও নতুন অর্থবিলে সেই বিধান রাখা হয়নি।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৎ করদাতাদের প্রতি বৈষম্য তৈরি করে এবং কর সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। নতুন সিদ্ধান্তকে সেই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন অর্থবিলে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা বিবেচনা করেই এই সীমা বাড়ানো হয়েছে।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন নম্বর বাধ্যতামূলক না রাখার সিদ্ধান্তও অর্থবিলের একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে এসেছে।

সরকার মনে করছে, টিআইএন বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক সাধারণ মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছিলেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং আরও বেশি মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন।

বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার একটি দুর্বল ও বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তবে সব বাধা অতিক্রম করে দেশকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকার আশাবাদী।

তিনি বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগোতে চায়। বেসরকারি খাত, উদ্ভাবন এবং কর্মসংস্থানকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে যেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং মেধা ও শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ নিয়ে সংসদে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে।

তবে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ইতিবাচক প্রবণতা এবং প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার করের হার বাড়াতে চায় না। বরং নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে করের আওতা সম্প্রসারণ করা হবে।

তিনি বলেন, কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়াতে করনীতি ও কর ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ছোট মুদি দোকানগুলোকে একক হারের ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে রাখা হবে, যাতে ছোট ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত চাপের মুখে না পড়েন।

অর্থমন্ত্রী সংসদে জানান, চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগের কারণে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হবে। চলতি অর্থবছরে যা ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।

অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

সরকার মনে করছে, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে।

পূর্ববর্তী সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে দেশের ঋণঝুঁকি বেড়েছে।

তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। যা দেশের মোট জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।

এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।

এই বিপুল ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঋণনির্ভরতা কমাতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা, বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং ইকুইটি ফাইন্যান্সিং জোরদারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক অপরাধ ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশ-বিদেশে মোট ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে বলেও সংসদকে জানান তিনি।

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টির বেশি ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি করেছে।

ভিওডি বাংলা/জা


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ফাইল ছবি
ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন লাগবে না, করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা
ছবি: সংগৃহীত
পুরোনো মালিকদের ব্যাংকে ফেরার ধারা বাতিলের ঘোষণা
ছবি: সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ঢাকায় বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ড. রঞ্জিত পোদ্দারকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। ছবি: ভিওডি বাংলা
শিক্ষকের বিদায়ে আবেগঘন আয়োজন, টিটিসিতে বিরল দৃষ্টান্ত