৩৯ বছরে পা, অপূর্ণতা পেরিয়ে বিশ্বজয়ের নায়ক মেসি

রোজারিওর ছোট্ট এক শহর থেকে শুরু হয়েছিল স্বপ্নের পথচলা। সেই ছেলেটিই আজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি। সময়ের ক্যালেন্ডারে আরেকটি বছর যোগ হলো, তবে কোটি ভক্তের কাছে দিনটি শুধুই জন্মদিন নয়- এটি সংগ্রাম, ব্যর্থতা, প্রত্যাবর্তন আর বিশ্বজয়ের এক অনন্য গল্প। আজ ৩৯ বছরে পা দিলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
বর্তমান প্রজন্মের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীর কাছে ফুটবল মানেই মেসি। তার ড্রিবলিং, গোল আর উদযাপনের মধ্য দিয়েই বড় হয়েছে একটি প্রজন্ম। আনন্দ, হতাশা, উল্লাস কিংবা অশ্রু—সব আবেগের সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে একটি নাম, লিওনেল মেসি।
তবে এই কিংবদন্তির শুরুর গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন মেসি। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন। অনেকের স্বপ্ন যেখানে থেমে যায়, মেসির গল্প সেখানে নতুন পথ খুঁজে নেয়।
২০০০ সালের সেই বিখ্যাত ‘ন্যাপকিন চুক্তি’ আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। বার্সেলোনার তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ একটি ন্যাপকিনে স্বাক্ষর করে বার্সেলোনায় নিয়ে আসেন কিশোর মেসিকে। সেখান থেকেই বদলে যেতে শুরু করে ফুটবলের ভবিষ্যৎ।
লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা ক্ষুদে ফুটবলার খুব অল্প সময়েই বুঝিয়ে দেন, তার পায়ে আছে ভিন্ন এক জাদু। রোনালদিনহোর ছায়া পেরিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বার্সেলোনার কেন্দ্রবিন্দু। ড্রিবল, গোল আর রেকর্ডের পর রেকর্ডে ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেন তিনি। যেন মাঠটাই ছিল তার শিল্পের ক্যানভাস।
পেপ গার্দিওলার অধীনে বার্সেলোনা যখন আধুনিক ফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছিল, সেই দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা ছিলেন মেসি। চারটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, একাধিক লা লিগা শিরোপা, ব্যালন ডি’অর ও গোল্ডেন বুট—সব অর্জন যেন ধরা দিচ্ছিল তার পায়ের জাদুতে।
তবে ক্লাব ফুটবলে সফল হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন আক্ষেপ তাড়া করে ফিরেছে তাকে। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে মাঠে নেমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। শুরু থেকেই জাতীয় দলের পথটা যে কঠিন হবে, যেন সেদিনই ইঙ্গিত মিলেছিল।
এরপর একের পর এক হতাশার রাত। ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল, ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল, টানা ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে বিষণ্ন হয়ে উঠেছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
বিশেষ করে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনাল আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গভীর ক্ষত হয়ে আছে। মারাকানায় ট্রফির এত কাছে গিয়েও শিরোপা ছুঁতে না পারার সেই মুহূর্ত কোটি ভক্তকে কাঁদিয়েছিল।
২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল, হয়তো অপূর্ণই থেকে যাবে তার গল্প।
কিন্তু সত্যিকারের কিংবদন্তিরা হার মানেন না। দেশের মানুষের ভালোবাসা আর অনুরোধে আবারও ফিরলেন তিনি। সমালোচনা সহ্য করলেন, লড়াই চালিয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল গল্পের শেষ অধ্যায়।
২০২১ সালে অবশেষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে প্রথম বড় শিরোপার স্বাদ পান মেসি। মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মুহূর্তটি যেন বহু বছরের আক্ষেপ মুছে দিয়েছিল।
তবে তার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় এক মহিমা। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ।
যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা, সমালোচনা আর অপমান সহ্য করতে হয়েছে, সেই বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত ধরা দেয় তার হাতে। পূর্ণতা পায় মেসির ক্যারিয়ার।
সৌদি আরবের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা শেষ হয় লুসাইল স্টেডিয়ামে সোনালি হাসিতে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনালের পর বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলা মেসির ছবি ফুটবল ইতিহাসের অমর অধ্যায়ে জায়গা করে নেয়।
৩৯ বছরে পা রাখলেও মেসির আলো এখনো ম্লান হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের দিকেও নজর রেখে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তরুণ তারকাদের ভিড়েও এখনো বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
সম্ভবত খুব বেশি দিন আর তাকে মাঠে দেখা যাবে না। কিন্তু তিনি থাকুন বা না থাকুন, ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসি চিরকাল উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হিসেবেই বেঁচে থাকবেন।
শুভ জন্মদিন, লিওনেল মেসি।
ভিওডি বাংলা/এমএস







