এআই দিয়ে নথি লেখায় মামলা খারিজ, আইনজীবী বহিষ্কার

যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালত এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটি চলমান দেওয়ানি মামলা মামলায় উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তাদের আইনি খসড়া বা ‘ব্রিফ’ তৈরি করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করেছিলেন। সেখানে ভুয়া আইনি নথির উল্লেখ ছিল। এমন তথ্য প্রমাণ হওয়ায় বিচারক এই কঠোর পদক্ষেপ নেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে এ তথ্য।
মার্কিন গণমাধ্যমটি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আদালতের শুনানিতে জানা যায়, আইনজীবীদের জমা দেওয়া নথিপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা কাল্পনিক আইনি রেফারেন্স ও ভুয়া মামলার উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পর মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ শারিয়ন এইকক মামলার চার আইনজীবীকে আদালত থেকে বহিষ্কার করেছেন, তাদের ওপর বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা আরোপ করেছেন এবং দুই আইনজীবীকে আগামী দুই বছরের জন্য উত্তর মিসিসিপি ডিস্ট্রিক্ট আদালতে ওকালতি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
গত সোমবার আদালতের দেওয়া এক আদেশে বিচারক শারিয়ন এইকক উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট চার আইনজীবী ‘ফেডারেল রুলস অব সিভিল প্রসিডিউর’-এর ১১ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করেছেন। এই ধারা অনুযায়ী, আদালতে কোনো নথি জমা দেওয়ার সময় আইনজীবীদের নিশ্চিত করতে হয় যে তার ভেতরের সমস্ত তথ্য সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ।
নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচারক এইকক তাঁর আদেশে লিখেছেন, ‘এই মামলাটি আদালতের সামনে অত্যন্ত অস্বাভাবিক এক চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে মামলার উভয় পক্ষের আইনজীবীরাই একই ধরনের শাস্তিযোগ্য অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আদালতকে আবারও আইনি নথিপত্রে এআই হ্যালুসিনেশন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাল্পনিক তথ্যের বোঝা টানতে হচ্ছে। আইনি পেশায় যাচাই-বাছাই ছাড়া যেভাবে এআই-এর ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, তাতে স্থানীয় আইনজীবীরা যেভাবে অন্ধের মতো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছেন, এটি তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।’
মূল মামলাটি ছিল মিসিসিপির অ্যাবারডিন শহর এবং আইনজীবী টম উইদার্সের মধ্যে আইনি ফি সংক্রান্ত একটি চুক্তি সংক্রান্ত বিরোধ।
মামলায় যে দুই আইনজীবীর ওপর দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তাঁরা হলেন ক্যাথলিন উইলসন এবং ক্যাথরিন উইলিয়ামস। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ক্যাথলিনকে ২ হাজার ৫০০ ডলার এবং ক্যাথরিনকে ৩ হাজার ৫০০ ডলার জরিমানা করা হয়েছে।
অন্য দিকে, সরাসরি আইনি নথি তৈরির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও স্থানীয় সহযোগী হিসেবে নথিতে সই করার দায়ে শুনানিতে অংশ নেওয়া অপর দুই আইনজীবী শনসি হান্টার রিডওয়ে এবং মার্ক ম্যাকক্লিনটনকে আদালত থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি ১ হাজার ডলার করে জরিমানা করা হয়েছে।
আইনজীবী রব ফ্রুন্ড, যিনি প্রথম এই মামলায় এআই ব্যবহারের অসংগতিগুলো চিহ্নিত করেন, পুরো বিষয়টিকে একটি ‘কমেডি অব এররস’ বা চরম ভুলের ভাঁড়ামি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘এখানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যেখানে দুই পক্ষই নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে চ্যাটজিপিটি বা কোনো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে টাকা দিচ্ছিল।’
আইনি পেশায় এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত মাসেও যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাই পিলোঁ’ নামক প্রতিষ্ঠানের সিইও মাইক লিন্ডেলের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলায় এআই দিয়ে জালিয়াতি করার অভিযোগ ওঠে। ফেডারেল জজ নিনা ওয়াং সে সময় জানান, আইনজীবীদের জমা দেওয়া নথিতে অন্তত ৩০টি ভুয়া রেফারেন্স এবং কাল্পনিক মামলার বিবরণ ছিল।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, কানাডাতেও সম্প্রতি এক আইনজীবী আদালতে এমন নথি জমা দিয়েছিলেন যেখানে কাল্পনিক মামলার লিংক এবং আইনি বিশ্লেষণের নামে অসত্য তথ্য বা ‘এআই হ্যালুসিনেশন’ পাওয়া যায়।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যথাযথভাবে যাচাই না করে আইনি বা গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহার করা হলে তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যার প্রমাণ হিসেবে মিসিসিপির এই মামলাটি একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।
ভিওডি বাংলা/জা







