ফাঁসির আদেশ দিলেই হবে না, বাস্তবায়ন করতে হবে: শহীদ মিরাজের বাবা

রাজধানীর মিরপুরে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালতে এসে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জুলাই আন্দোলনে নিহত মিরাজুল ইসলাম মিরাজের বাবা আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, শুধু আদালত থেকে ফাঁসির রায় ঘোষণা করলেই হবে না, সেই রায় দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রকৃত ন্যায়বিচার পাবে না।
রোববার (৭ জুন) আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতা ও নানা ধরনের ফাঁকফোকরের কারণে অনেক সময় প্রকৃত বিচার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না।
আব্দুস সালাম বলেন, “দোষীদের শুধু ফাঁসির আদেশ দিলেই হবে না, সেই ফাঁসি যেন কার্যকর হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমার পরিবারসহ দেশের অন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।”
তিনি আরও বলেন, সরকারকে এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে যেখানে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা আইনি ফাঁক থাকবে না, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই পার পেতে না পারে। তার আশঙ্কা, মামলাগুলো যদি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা চূড়ান্ত বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।
আব্দুস সালাম অভিযোগ করেন, তিনি বিভিন্ন সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাদের সামনে জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে কথা বলেছেন। তবে এখন পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি তিনি দেখতে পাননি।
তিনি বলেন, “আমি আগেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে বলেছি, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এখনো কেন আইনের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না, কেন মামলাগুলোর অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়-এ প্রশ্ন আমার।”
তার অভিযোগ, মিরাজ হত্যার ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ-ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ সব ধরনের তথ্য তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হলেও চার্জশিট দাখিলে অগ্রগতি নেই।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আমার ভয় হয়, শেষ পর্যন্ত এই মামলাটাও হয়তো বাতিল হয়ে যাবে, কিংবা আমরা বিচার পাব না,” বলেন তিনি।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম মিরাজ ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। তিনি অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনা এবং সংসারের খরচ বহন করতেন।
মিরাজ মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় আসেন। পরে দনিয়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন। পাশাপাশি যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল রশিদবাগ এলাকায় একটি মোবাইল রিচার্জ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানে কাজ করতেন।
পরিবার জানায়, বাবার চিকিৎসার জন্য কয়েক লাখ টাকার ঋণের বোঝাও ছিল তার ওপর। এই অবস্থায় পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিলেন মিরাজ।
গত বছরের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ী থানার সামনে তিনি আন্দোলনে অংশ নেন। সেখানে ভিডিও ধারণের সময় হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন তিনি এবং তার খালাতো ভাই মাজেদুল ইসলাম। পরে আহত অবস্থায় দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ আগস্ট মিরাজ মারা যান, তবে তার খালাতো ভাই বেঁচে যান।
ছেলের মৃত্যুর পর থেকে একাধিকবার বিচার দাবি করে আসছেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, এই শোকের মধ্যেও পরিবার প্রতিদিনই ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছে।
তিনি বলেন, “ছেলের মৃত্যুর পর আমাদের একেকটা দিন যেন একেকটা বছর।”
তিনি আরও বলেন, তাঁর একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে পরিবার এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, দেশের অন্য ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি।
তার ভাষায়, “আমার একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেটি আর নেই। তার মৃত্যুতে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে। এখন আমি শুধু আমার সন্তানের বিচার চাই না, এমন বিচার চাই যা অন্য পরিবারগুলোকেও ন্যায়বিচারের আশা দেবে।”
আব্দুস সালাম দৃঢ়ভাবে বলেন, বিচার শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না, সেটি বাস্তবে কার্যকর হতে হবে। তিনি মনে করেন, কঠোর ও দ্রুত বিচারই ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে পারে।
তিনি বলেন, “যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নেও দেখতে চাই।”
ভিওডি বাংলা/জা







