• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

মেলার মানুষ

মানুষ দেখা মেলা দেখা

   ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ০২:৪০ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

শনিবারের বইমেলাতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। শুক্রবার পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে ছিলো পবিত্র শবে বরাতও। ফলে শবে বরাতের পরের দিন এতোটা ভিড় হবে আশা করিনি। কিন্তু মানুষ এসেছেন। শুক্রবারের মতো অতোটা না হলেও অনেক মানুষের উপস্থিতি প্রাণের মেলাকে প্রাণময় করে তুলেছে।

মেলায় ঢুকি পাঁচটা বাজার কিছু আগে।  পরিচিত মানুষজন খুঁজি। দেখা মেলে না কারো। দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ মুক্তমঞ্চের সামনে। মানুষ দেখি। মানুষ দেখার রোগ আমার খুব পুরনো। মনে আছে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম— প্রতি সকালে কলাভনের গেটের সিঁড়িতে বসে থাকতাম, আর মানুষ দেখতাম। বিকেলেও বসতাম মাঝে মাঝে। কত রকম মানুষ যে চোখে পড়তো। একেক জনের একেক রকম হাঁটার ভঙ্গি। একেক রকমভাবে হাসা কথা বলা। সকালের দিকে যাদের দেখতাম— বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী শিক্ষক কর্মচারি। বিকেলের দিকে চোখে পড়তো বাইরের মানুষ বেশি। হয়তো কোনো কাজে ক্যাম্পাসে এসেছেন তারা, হয়তো এমনি বেড়াতে এসেছেন। তবে সদ্য কৈশোর পেরোনো সময়ে সেই যে মানুষ দেখার শুরু এরপর থেকে কেবল মানুষই দেখে আসছি। এতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেও এখনো মানুষ চেনা হয়নি আমার। আপন পর চিনতে ভুল করি এখনো। তবে এই ভুল করা নিয়ে কোনো আফসোস নেই। কোনো আক্ষেপ নেই।  আমার একটা কবিতা আছে — ভুল মানুষে নতজানু  হয়ে মগ্ন থাকি ভুল সৌরভে।/ তারপর কেটে যায় বেলা অবেলা!/ একদি খুব করে হেরে যাবো/ জিতে গিয়েও পস্তাবে। সুতরাং মানুষ চিনতে ভুল হয়ে যায় বলে কোনো আক্ষেপ নেই। তবুও আমি মানুষেই আস্থা রাখি। রবীন্দ্রনাথ তো বলেই গেছেন— মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।

মেলায় কত রং বেরংয়ের মানুষ। নানা বয়সের।  আজকে দেখি সপরিবার এসেছেন অনেকেই। বাবা মা ছোট্ট সন্তান। টুকটুক করে হাঁটছেন তারা। বইয়ের খোঁজ করছেন। সেলফি তুলছেন। বড় ভালো লাগে এস্ মনোহর দৃশ্য দেখে। 
সময় গড়িয়েছে অনেক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এবার হাঁটতে থাকি। হাঁটা পথে দেখা হয়ে যায় আপন অপুর সঙ্গে। সেলফোন উঁচুঁ করে ভিডিও করছে সে।
—    কি করে কিসের ভিডিও করিস?
—    ভাই ক্যামেরা পাই নাই এখনো। তাই মোবাইলের ভিডিও দিয়ে একটা নিউজ বানানোর চেষ্টা করছি!
—    ওহ আচ্ছা। ভালো, খুব ভালো।
আমার ভালো বলার ভঙ্গি দেখে আপন অপু হাসে। অপু একটা বেসরকারি টিভি চ্যানেলে কাজ করে। কাজের প্রতি তার নিবেদন দেখে ভালো লাগে।
—    ঠিক আছে কাজ কর তুই? আমি আগাই।
—    কতক্ষণ আছেন মেলায়?
—    এই তো আছি কিছুক্ষণ।
—    ঠিক আছে ভাই দেখা হবে।
হেঁটে হেঁটে সংযোগ প্রকাশনীতে যাই। সংযোগ থেকে আমার একটা গল্পবই বের হওয়ার কথা। ১৫দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো বইয়ের দেখা নেই! কাদের বাবুর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার। স্টলে গিয়ে দেখি বাবু নেই! ফোন করি তাকে।
—    বন্ধু আমি বাবুইয়ে আছি। আসছি এক মিনিটের মধ্যে।
দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি বাবুর জন্য। সংযোগের স্টলে আমার একটা ছবির সঙ্গে দুইটা বইয়ের প্রচ্ছদ দেখি। এরমধ্যে ’নকশাকাটা সকাল’ এখনো প্রকাশ হয়নি। এটার জন্য কথা বলতেই বাবুর কাছে আসা।  গল্প জমানোর চেষ্টা করি স্টলের ছেলেটার সঙ্গে।
—    কি অবস্থা বেচা বিক্রি কেমন চলছে?
—    এই তো ভাই চলছে মোটামুটি। গতকাল ভালোই বিক্রি হয়েছে।
—    ওহ আচ্ছা তাহলে তো খুবই ভালো! আমার বই চলে? এখানে আমার একটা কবিতাবই আছে— ’তারপর চেয়ে দেখি রাই’। গত বছর প্রকাশ হয়েছিলো। সেটার কথা জানতে চাই।
—    চলে ভাই। তবে খুব একটা বেশি না!
—    ওহ আচ্ছা।
এরই মাঝে হেলতেদুলতে এসে হাজির হয় কাদের বাবু।
—    দোস্ত কেমন আছিস।
—    আছি ভালোই। তুই কেমন আছিস?
—    আছি রে দোস্ত নানা ঝামেলায়।
—    আমার বইটা এখনো প্রকাশ হলো না রে বন্ধু।
—    হবে বন্ধু একটু অপেক্ষা কর। দুয়েকদিনের মধ্যে হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
—    ঠিক আছে দেখ! মেলার অর্ধেক তো চলেই গেলো!
—    বুঝিসই তো দোস্ত। টাকা পয়সা নিয়ে সঙ্কটে আছি। তবে করে ফেলবো ইনশাআল্লাহ।
—    দেখ যেটা ভালো মনে করিস!
—    চল বাবুইয়ের দিকে যাই। বলে কাদের বাবু।
—    ঠিক আছে চল।

হেঁটে হেঁটে দুজন যাই শিশু চত্বরে বাবুইয়ের স্টলে। স্টলের সামনে বেশ ভিড়। দুই ইউনিটের স্টল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পাঁচ ছয়জন বিক্রয়কর্মী। বাবু স্টলের ভেতর থেকে একটা গদিওলায়ালা লম্বা টুল বের করে আনে। স্টলের সামনের খোলা জায়গা পেরিয়ে রাস্তা ছেড়ে দিয়ে একেবারে দেয়াল ঘেঁষে বসি আমরা। এখানেও দেখি আপন অপু এসে হাজির। নানান বিষয়ে আড্ডা হয় আমাদের। কথার ফুলঝুরি ছুটতে থাকে একেকজের মুখে। আমি কথা বলি কম। শুনতেই বেশি ভালো লাগে। আপন অপু মোবাইল হাতে আমাদের সেলফি তোলে। সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের দল আমাদের দিকে কৌতুহলী চোখে তাকায়। 
—    বন্ধু আমি উঠি। বাবুর দিকে তাকিয়ে বলি।
—    এখনই উঠবি কি! বস আরেকটু।
—    না রে। ভালো লাগছে না। চলে যাবো।

আর কথা বাড়ায় না কাদের বাবু। ধীর পায়ে হাঁটতে থাকি বের হওয়ার গেটের দিকে। সাড়ে ছয়টার মতো বাজে। মেলায় ঢোকার মুখের ভিড় কিছুটা কমেছে। তবে বের হওয়ার মুখে প্রচুর ভিড়। মানুষ গায়ে গায়ে লেগে হাঁটছে। তার ওপর দেখি মেলার ঘেরাও দেয়া জায়গার মধ্যেই প্লাস্টিকের খেলনা থেকে শুরু করে নানা রকম জিনিসপাতির দোকান নিয়ে বসেছেন ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা। অন্যান্য বছর এটা কম ছিলো। চলার পথের এখানে সেখানে কিশোর তরুণের দল জটলা করে আড্ডা দিচ্ছে। মেয়েরা রাস্তা বন্ধ করে সেলফি তুলছে। পাশেই পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছে সব। কাউকেই কিছু বলছে না। খুব নির্বিকার ভঙ্গি তাদের। আমিও নির্বিকারভাবে বের হয়ে আসি মেলা থেকে।

ভিওডি বাংলা/এম 


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়