খানজাহান আলীর দিঘিতে শিশুকে টেনে নিয়েছে কুমির

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.) মাজার-সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়ে ফাতেমা (৭) নামে এক শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তাকে উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার (১ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে রাত ৯টার দিকে স্থানীয়রা নৌকা নামিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস, র্যাব, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন। দিবাগত রাত ১টা পর্যন্ত (এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত) শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মাজার সংশ্লিষ্ট সূত্র ও পুলিশ জানায়, কুমিরের আক্রমণের শিকার ফাতেমা আক্তার মাজার এলাকায় অবস্থান করা এক মানসিক প্রতিবন্ধী নারীর মেয়ে। তবে তার পরিচয় সম্পর্কে এর বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার সময় ঘাটে অনেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। গোসলের জন্য পানিতে নামার পরপরই শিশুটিকে কুমির টেনে নিয়ে যায়। এ সময় সে এবং আশপাশের লোকজন চিৎকার করলেও আতঙ্কে কেউ তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসতে পারেননি।
ঘাটসংলগ্ন এক দোকানি বিনা বলেন, “আমি দেখেছি বাচ্চাটা মহিলা ঘাটে গোসল করতে গিয়েছে। আমি পাশেই ছিলাম কিন্তু বুঝতে পারিনি পানির নিচে কুমির এসেছে। বাচ্চাটি এক সিড়ি নামতেই কুমিরে ওর মাজা ধরে কামড় দিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় দুই হাত তুলে মেয়েটি একবার চিৎকার দিয়েছিল। তারপরে আমি সেখানে যেতেই কুমিরে পানির নিচে নিয়ে চলে যায়।”
খবর ছড়িয়ে পড়লে বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ, জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মহিদুল ইসলাম, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী এবং মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় হাজারো মানুষ দিঘির পাড়ে ভিড় জমালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, “খবর শুনে স্থানীয় অনেক মানুষ ভীড় করেছে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শিশুটিকে না পাওয়া পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলবে।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য কয়েকটি টিম কাজ করছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, “মাজারে এ ধরনের ঘটনা মাজারের ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেজন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।” প্রয়োজনে ঘাট এলাকায় ফেন্সিং করার কথাও জানান তিনি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বাগেরহাট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা শেখ মামুনুর রশিদ বলেন, “কুমির যেহেতু হিংস্র প্রাণী, তাই পানিতে নামাটা ঝুঁকিপূর্ণ। আবার রাতের বেলা। তারপরও আমরা খোঁজাখুঁজি করছি। আর বাগেরহাটে কোনো ডুবুরি দল নেই। এটাও একটা অসুবিধা।”
উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল একই দিঘির ঘাট থেকে একটি কুকুরকে টেনে নিয়ে যায় কুমিরটি। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তখন মাজার এলাকায় কুমিরের উপস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে থাকা কুমিরটি খানজাহান আলী (রহ.)-এর অবমুক্ত করা কুমিরের বংশধর নয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, খানজাহান আলী (রহ.) দিঘিটি খননের পর সেখানে এক জোড়া কুমির অবমুক্ত করেছিলেন। পরে পুরুষ কুমিরটির নাম রাখা হয় ‘কালা পাহাড়’ এবং স্ত্রী কুমিরটির নাম ‘ধলা পাহাড়’। পরবর্তী সময়ে তাদের বংশধরদের ক্ষেত্রেও একই নাম ব্যবহার করা হতো। সর্বশেষ ওই বংশের কুমিরের মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়। সময়ের ব্যবধানে কয়েকটি কুমির মারা যায়। সর্বশেষ দুটি কুমির টিকে ছিল। এর মধ্যে একটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়। বর্তমানে দিঘিতে একটি মাত্র কুমির রয়েছে।
ভিওডি বাংলা/বিন্দু







