• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

মেলার মানুষ

কোলাহলের নির্জনতা

   ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ১১:৫৫ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

দেখতে দেখতে বারোদিন পেরিয়ে গেলো মেলার। ভালো মন্দ মিলিয়ে চলছে সব। তবে  লেখক প্রকাশকদের বেশিরভাগই বলছেন বেচা কেনা এবার কম। দেখা যাক— মেলার প্রায় অর্ধেক সময় তো পার হয়েছে, এবার নিশ্চয় জমবে বেচা কেনা।
আজ সারাদিন ধরে মনি ভাই ফোন দিচ্ছেন। তিনি মেলার মাঠে একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা শুরু করেছেন ক’দিন হলো। অনুষ্ঠানের নাম অনিন্দ্য প্রকাশ নিবেদিত কাব্যশীলন সাহিত্য সরোবর। মনি ভাইয়ের নির্দেশ আগামীকাল আমাকে সেখানে অতিথি হতে হবে এবং মেলার মাঠে থাকতে উপস্থিত থাকতে হবে ঠিক সাড়ে তিনটায়। আমি বারবার মানা করি। কারণ কারণ সাড়ে তিনটার মধ্যে মেলায় ঢুকতে পারবো না নিশ্চিত। কিন্তু মনি ভাই নাছোড়।
—    কিসের এতো কাজ তোমার?
—    ভাই অফিসের মিটিং আছে তিনটায়। মিটিং শেষ করে আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। অন্য আরেকদিন আসবো আপনার অনুষ্ঠানে।
—    ধুর মিয়া রাখো তোমার মিটিং। চলে আসবা অবশ্যই। আর তোমার একটা ছবি পাঠিয়ে দিয়ো।
—    ভাই আমারে মাফ কইরা দিলে হয় না!
—    আর কোনো কথা বলবা না!
—    ঠিক আছে ভাই।
মেলায় আমি প্রতিদিন যাই বটে। কিন্তু কোনো নিদিষ্ট সময় ধরে যেতে পারি না কখনো। কোনো দিন ছয়টাও বেজে যায় মেলায় ঢুকতে ঢুকতে। ক’দিন আগে বিখ্যাত বইমেলা সাংবাদিক জিনিয়া কবির সুচনা ও নীল মাহবুব বলেছিলো তাদের আয়োজনে যেতে। সেটাতেও সময় করে উঠতে পারিনি এখনো। নেক্সাস টেলিভিশনের একটা আয়োজন আছে বইমেলা নিয়ে। লেখক অরুণ কুমার বিশ্বাস উপস্থাপনা করেন। সেটাতে যাওয়ার জন্য অরুণদা এবং অনুষ্ঠানের উপস্থাক রানা বেশ জোরাজুরি করেছেন বেশ কয়েকদিন। যাওয়া হয়নি এখন পর্যন্ত। কেন জানি টিভিতে কথা বলতে ভালো লাগে না।  আসলে প্রচার মাধ্যম জিনিসটাই অসহ্য লাগে এখন। অথচ জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় কেটে গেলো প্রচার মাধ্যমে কাজ করে। এমনই হয় আসলে— যেটি করতে ভালো লাগে না সেটিই করে যেতে হয় আমরা বাধ্য হই প্রতিনিয়ত। অথচ এক সময় কি প্রচণ্ডভাবে ভালোবেসেছিলাম প্রচার মাধ্যমে কাজ করাকে। যাক, সে আলাপ ভিন্ন। এখানে এনিয়ে কথা বলে লাভ নেই। উচিৎও না।
তবে একবার বাংলা একাডেমি আয়োজিত লেখক বলছি মঞ্চে অতিথি হয়েছিলাম। সেটা বেশ উপভোগ করেছিলাম। সেখানে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মনি ভাই—ই। লেখালেখির জগতে এই মানুষটার কাছে আমার অশেষ ঋণ। প্রতি বছরই আমার বই বের হলে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন মনি হায়দার। এবার যেমন আমার গল্পবই— হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যার দিকে নিয়ে মনি ভাই লিখেছেন— ”আসুন আমরা খান মুহাম্মদ রুমেলের গল্পবিশ্বে প্রবেশ করি। ধরুন, আপনি অফিসে খুব দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন কিন্তু বিনমামেঘে বজ্রপাতের ঘোষণায় চাকরিটা নাই হয়ে গেলো এক শান্ত দুপুরে, কেমন হবে আপনার অনুভূতি? নৃশংস তো বটেই কিন্তু বেঁচে তো থাকতে হয় সকল অপমান আর তুচ্ছতার মধ্যেও। মানুষের এই বেঁচে থাকার পরিনাম আর লড়াইয়ের গল্প লেখেন খান মুহাম্মদ রুমেল, গল্পের পর গল্পে। চলতি বইমেলায় অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে এগারোটা গল্পের সমন্বয়ে এসেছে রুমেলের গল্পবই— হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যার দিকে।
চলুন জীবন পরিভ্রমণের এই সুবর্ণলগ্নে গল্পকার রুমেলের সঙ্গে আমরাও হেঁটে যাই অসাধারণ গল্প পথে!”
মাঝে মাঝে আমি অবাক হয়ে ভাবি— মনি ভাই লোকটা আমাকে কেন এতো ভালোবাসেন!
ঘুরে ঘুরে দেখি মেলার মানুষ। ফাগুন আসছে— আর মাত্র দুদিনের অপেক্ষা। বসন্তের আমেজ চারদিকে। হেঁটে হেঁটে চলে আসি শিশু চত্বরে। এবারে আজ প্রথমবারের মতো আসা শিশু চত্বরে। সপ্তাহের মাঝের দিন বলেই হয়তো খুব বেশি ভিড় নেই এখানে। হাঁটতে হাঁটতে শিশু চত্বরে চোখে পড়া একটা পলাশ গাছ। ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। ঢাকায় পলাশফুল খুব একটা চোখে পড়ে না। এমনিতে মেলায় এসে ছবি তোলার অভ্যাস আমার খুব একটা নেই। তবে গত বছর রুগ্ন গাছটায় অসংখ্য ফুল দেখে আমাদের একমাত্র সন্তান সমুদ্রকে নিয়ে একটা ছবি তুলেছিলাম এই পলাশ গাছের নিচে। তুলে দিয়েছিলেন আমার স্ত্রী। শিশু চত্বরের স্টলগুলো সব বর্ণিল সাজে সেজেছে। দেখতে খুবই ভালো লাগে।
বইমেলায় প্রতিবছর প্রকাশনীগুলোকে তার স্টল প্যাভিলয়েনর সাজ সজ্জার নান্দনিক দিক বিবেচনায় পুরস্কার দেয়া হয়। বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত এই পুরস্কারের নাম— ’শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। মনে আছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার এই পুরস্কার পেয়েছে অন্য প্রকাশ। এবারও অন্য প্রকাশ বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছে তাদের প্যাভিলিয়নটি। ওপরের দিকটায় ঢেউ তোলা টিনে কালো রঙ দিয়ে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দিয়েছে তারা। এক জায়গায় দেখা যায়— ত্রিকোণা টিন ফেটে বের হয়ে আসছে বইয়ে পাতা। এর মাধ্যমে কি বোঝাতে চেয়েছেন তারা? চারপাশের অন্ধকার ভেদ করে বের হয়ে আসছে জ্ঞানের আলো? এমনটা কি? কে জানে? জিজ্ঞেস করা হয়নি কাউকে। দেখি, একদিন সময় পেলে জানতে চাইবো অনিন্দ্য প্রকাশের কারো কাছে।
বাতিঘর তাদের প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছে সুন্দর করে। বাঁশ, পোড়ামাটির টালি আর জামদানি কাপড় দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়েছে তারা। মেলার শুরুর দিন থেকেই দেখছি তাদের প্যাভিলিয়ন ঘিরে ছবি শিকারিদের ভিড়। অন্যধারার প্যাভিলিয়নটি দেখতে ঠিক যেন জাতীয় সংসদ ভবন। আফসার ব্রাদাস বানিয়েছে ঠিক যেন গ্রামের টিনের ঘর। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চার ইউনিটের স্টলটি বানানো বিআরটিসির দোতলা বাসের আতলে। গাড়িতে করে পরিচালিত তাদের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কথা মাথায় নিয়ে হয়তো বানানো হয়েছে এমন স্টল। এছাড়া কুঁড়েঘরের আদলে স্টল যেমন আছে, তেমনই বেশকটি স্টল প্যাভিলিয়নের সজ্জায় ব্যবহার হয়েছে রিকশা চিত্র। যাদের মধ্যে অন্যতম অনন্যার প্যাভিলিয়ন।
হাঁটতে হাঁটতে পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। অনেককে আমি দেখি, কিন্তু তারা আমাকে দেখেন না। আজ আর কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে এমন হয় আমার— অনেক মানুষের মাঝে থেকেও একা হয়ে যেতে ভীষণ ইচ্ছে করে।
বের হয়ে যাই মেলা থেকে। শাহবাগমুখী রাস্তা ধরে হাঁটি। মাথার মধ্যে ভর করে আরণ্যক বসুর খুব পরিচিত একটা কবিতা — 

পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক
আমরা তখন প্রেমে পড়বো
মনে থাকবে?

বুকের মধ্যে মস্ত বড় ছাদ থাকবে
শীতলপাটি বিছিয়ে দেব;
সন্ধে হলে বসবো দুজন।
একটা দুটো খসবে তারা
হঠাৎ তোমার চোখের পাতায় তারার চোখের জল গড়াবে,
কান্ত কবির গান গাইবে
তখন আমি চুপটি ক’রে দুচোখ ভ’রে থাকবো চেয়ে…
মনে থাকবে?

এই জন্মের দূরত্বটা পরের জন্মে চুকিয়ে দেব
এই জন্মের চুলের গন্ধ পরের জন্মে থাকে যেন
এই জন্মের মাতাল চাওয়া পরের জন্মে থাকে যেন
মনে থাকবে?

ভিওডি বাংলা/এম


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়