মেলার মানুষ
কে কথা কয় কার কথা কয়

খান মুহাম্মদ রুমেল
বুলবুল আমার এক সময়ের সহকর্মী। বুলবুল রেজা ডাকসাইটে রিপোর্টার। ফোন দিয়েছিলো দুপুরবেলা।
— ভাই আজকে কি বইমেলায় যাবেন?
— যেতে পারি?
— কয়টার দিকে যাবেন?
— পাঁচটা সাড়ে পাঁচটা বেজে যেতে পারে।
— একটু আগে আসা যায় না ভাই? সাড়ে চারটার দিকে আসেন।
— আচ্ছা।
বনশ্রী থেকে চারটায় রওয়ানা দিয়ে জ্যাম ট্যাম পেরিয়ে মেলায় পৌছুতে পৌনে পাঁচটা মতো বেজে যায়। রাইড শেয়ারের বাইক শাহবাগে ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে থাকি। টিএসসির কাছাকাছি গিয়ে ফোন দিই বুলবুলকে।
— আমি মেলায় ঢুকছি। কোথায় তুই?
— ভাই আমার আর দুই মিনিট লাগবে। মেট্রোতে আছি। নামবো এখনই।
— আমি টিএসসির গেট দিয়ে ঢুকে মুক্তমঞ্চের সামনে দাঁড়াচ্ছি।
— থাকেন ভাই, আমি আসছি।
হেঁটে আসার কারণেই কিন না পানি পিপাসা লাগে খুব। মেলায় ঢুকেই এক বোতল পানি কিনে মুক্তমঞ্চের সামনে দাঁড়াই। মেলায় মানুষ এসেছেন ভালোই। চিরাচরিত আড্ডায় চলছে মেলার সময়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হাজির হয় বুলবুল। আমরা দুজন মেলা ঘুরে দেখি। কথা বলি নানা বিষয়ে। প্রতিদিন মেলায় বিভিন্নজনের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের নানা প্রশ্ন করি আমি। কিন্তু আজকে আমাকে বুলবুলের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
— ভাই মেলা কেমন দেখছেন?
— মেলা তো মেলার মতোই চলছে।
— কোনো পার্থক্য দেখছেন এবার?
— পার্থক্য বলতে এবার অনেক পরিচত মুখ মেলায় নেই। প্রতিবছর যাদের মেলায় দেখতাম, নানা কারণে তাদের অনেকেই এবার অনুপস্থিত।
— বেচা বিক্রি কেমন হচ্ছে এবার?
— এখন পর্যন্ত বেচা বিক্রি জমেনি বললেই চলে।
— আপনার গল্পবইয়ের খুব কাটতি দেখেছি গত কয়েকটি মেলায়। এবার কেমন চলছে আপনার বই?
— ওই যে বললাম সার্বিকভাবেই মেলা এবার খুব জমেনি। আমার বইও এর বাইরে নয়। চলছে না খুব একটা।
বুলবুল আরো নানা রকম প্রশ্ন করে। বিভিন্ন বিষয়ে আমার মন্তব্য জানতে চায়। আমার বইতে কী ধরণের গল্প আছে? কোন বিষয়ের ওপর লেখা— ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ জানতে চায় সে। কবিতাবই নিয়েও জানতে চায়। কথা বলি আর মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে বই দেখি আমরা।
আমাদের কথার মাঝখানেই ফোন করে শাতিলি শারমিন। শাতিলা আমাদের আরেকজন সহকর্মী। সংবাদভিত্তিক একটা বেসরকারি টেলিভশন চ্যানেলে তেরো বছর কাজ করেছি আমি। সখানে প্রায় বারো বছর আমার কলিগ ছিলো শাতিলা। তবে শাতিলার সঙ্গে পরিচয় আরো অনেক আগে। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকার সময়। শাতিলা ক্যাম্পাসে আমার দুই বছরের জুনিয়র। তখন আমি কাজ করতাম আরেকটি টেলিভিশনে। আর শাতিলা কাজ করতো একটি রেডিওতে। সেই থেকে আমাদের পরিচয়। এরপ কত সময় গেছে কত উত্থান পতন জীবনে কত পরিবর্তন। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা রয়ে গেছে আগের মতো। বুলবুলও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। খবরের মাঠে তার সঙ্গে পরিচয়। এরপর আমরা একই অফিসে কাজ করেছি— প্রায় তিন বছর। এখন আমি আর বুলবুল আলাদা দুটি জায়গায় কাজ করি। শাতিলা শুধু রয়ে গেছে আমার সাড়ে তেরো বছরের কাজ করা প্রতিষ্ঠানে।
— ভাইয়া কোথায় তুমি? জানতে চায় শাতিলা।
— ঐতিহ্যের সামনে আছি, আমি আর বুলবুল।
— ওহ বুলবুলও এসেছে? দাঁড়াও আসছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে এসে হাজির হয় শাতিলা। মেলার মাঠ থেকে একটি সরাসরি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে শাতিলা। উপস্থাপকের মার্জিত সাজে খুব সুন্দর লাগে তাকে।
— কেমন আছো ভাইয়া? আরে বুলবুল তোর কি খবর? দুজনকে এক সঙ্গে প্রশ্ন করে শাতিলা।
— ভালো আছি। তোমার কি খবর আপা? বুলবুল বলে। আমি কোনো কথা বলি না, নীরবে হাসি।
— কখন এলি?
— এই তো একটু আগে।
— চল ভাইয়া তোমার বই কিনবো?
তিনজন হেঁটে হেঁটে যাই অনিন্দ্য প্রকাশের সামনে। শাতিলা দুটি বই কেনে, বুলবুলও।
— কফি খাবি তোরা?
— হ্যাঁ চলো, আগে তো প্রতিবছর কফি খাওয়াইতা!
— চল আজকেও খাওয়াবো, মেলার মাঠের বিস্বাদ কফি।
তিন কাপ কফি নিয়ে আমরা তিনজন দাঁড়াই মুক্তমঞ্চের পেছন দিকটায় লিটলম্যাগ চত্বরের পাশে। ঘুরেফিরে নানা প্রসঙ্গ আসে। আমাদের পেশাজীবনের কথা, সমাজ রাষ্ট্র সাহিত্য বইমেলা লেখালেখি— নানা বিষয় নিয়ে আলাপ চলতে থাকে আমাদের।
— আপা তোমার প্রমোশন হয়েছে। আমাদের খাওয়াবা কবে বলো? বুলবুল বলে।
— ধুর আর প্রমোশন, ভালো লাগে না রে কিছু।
— এইসব বললে হবে না, খাওয়াইতে হবে আপা।
— আচ্ছা দেখবো নে।
— তুমি তো এখন বড় সাংবাদিক! ভাবসাবই আলাদা!
— ভাইয়া দেখোতো বুলবুল কি বলে? তোমাদের সঙ্গে কি আমার বড় ছোট দিয়ে পরিচয়— তুমি বলো ভাইয়া?
আমার দিকে তাকিয়ে বলে শাতিলা। আমি কিছু বলি না— শুধু হাসি!
— সেই ক্যাম্পাসে থাকার সময় থেকে তোমাকে চিনি, তখন কি আমরা জানতাম কে কোথায় যাবো, কিংবা জীবনে কে কি হবো! তবুও তো হাসি কান্নায় এক হয়ে আছি এতোটা সময়! একটানা বলে চলে শাতিলা।
আর আমি মনে মনে ভাবি, আজ থেকে তেরো চৌদ্দ বছর আগে কাজের সুবাদ একটা জায়গায় জড়ো হয়েছিলাম আমরা। এরপর সেই দীর্ঘ সময়ে কত মানুষ এলো গেলো, কত সম্পর্ক কত পরিচয় দিনে দিনে গভীর হয়েছে। কেউ কেউ হারিয়ে গেছে, দূরে সরে গেছে। আমরা তখন কেউ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, কেউ সদ্য শেষ করেছি প্রথাগত পাঠ জীবন। পরের তেরো চৌদ্দ বছরে জীবনের মোড় ঘুরে গেছে একেকজনের একেক দিকে! তবুও মাঝে মাঝে দেখা হলে কি প্রগাঢ় মমতায় আর খুনসুটিতে মেতে উঠি। কথা বলতে বলতে শাতিলার ফোনে মেসেস আসে একটা। ফোনের দিকে তাকিয়ে শাতিলা বলে— সব্যসাচীর স্টলে মনে হয় ঝামেলা হচ্ছে।
— কি নিয়ে ঝামেলা? জিজ্ঞেস করি আমি।
— মনেহয় তসলিমা নাসরিনের বই নিয়ে।
— ওহ আচ্ছা।
— দেখি ভাইয়া আমি ওদিকে যাই। খোঁজ নিই কি হচ্ছে?
— ঠিক আছে যা, আমরা বরং বের হই।
শাতিলা চলে যায় খবরের খোঁজে। আমি আর বুলবুল বের হয়ে আসি মেলা থেকে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ । মেলা থেকে বের হয়ে রিকশা নিই আমি আর বুলবুল। যেতে যেতে বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল ব্রাউজ করি। গণমাধ্যমগুলো বলছে তসলিমা নাসরিনের বই প্রকাশ করা নিয়ে লেখক প্রকাশক শতাব্দী ভব’র ওপর হামলা করেছে একদল মানুষ। আবার কোনোটা বলছে, শতাব্দী ভব প্রথমে কাউকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর কোনো কথা বলেছেন। ফলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে সব্যমাচী প্রকাশনীর স্টল বন্ধ কর দিয়েছে। শতাব্দীকে নিয়ে গেছে হেফাজতে। এ নিয়ে নানা রকম ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। আবার খবর পাই স্টল বন্ধ করে দেয়া এবং শতাব্দীকে হেফাজতে নেয়ার প্রতিবাদ করছেন কিছু মানুষ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারও চলছে এনিয়ে। আমাদের রিকশা তখন শাহবাগমুখী। আমি আর বুলবুল দুজনেই বসে আছি চুপচাপ। আমার মনে পড়ে অনেক বছর আগে এই বইমেলা থেকে ফেরার পথে আক্রান্ত হয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। এই বইমেলা থেকে ফেরার পথে খুন হয়ে গিয়েছিলেন অভিজিৎ রায়।
ভিওডি বাংলা/এম







