জব্বার মোড়ের ছোট্ট দোকানে বড় এক স্বপ্নের গল্প

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জব্বার মোড়। ভোরের আলো একটু গাঢ় হতেই জায়গাটা যেন জেগে ওঠে তরুণ স্বপ্নের কোলাহলে। ক্লাসে যাওয়ার তাড়া, ল্যাব শেষে ক্লান্ত পা, হাতে ছাপানো নোটের গন্ধ, কোথাও থিসিসের বাঁধাই, কোথাও আবার শেষ মুহূর্তে স্লাইড খোঁজার ব্যস্ততা। এই ব্যস্ততার মাঝখানে ছোট্ট এক দোকান প্রতিদিন নীরবে জুড়ে দেয় হাজারো শিক্ষার্থীর দিনযাপন, দুশ্চিন্তা আর স্বপ্নকে। দোকানটির নাম ‘স্বপন কম্পিউটার অ্যান্ড ফটোস্ট্যাট’।
দোকানটির ভেতরে সারাক্ষণই শোনা যায় প্রিন্টারের টুকটুক শব্দ, কাগজ ওলটানোর মৃদু আওয়াজ আর শিক্ষার্থীদের পরিচিত ডাক, “স্বপন ভাই, একটু তাড়াতাড়ি দেন তো!” সেই ডাকের ওপাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকেন মোহাম্মদ সুজাউদ্দীন স্বপন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু একজন ফটোকপি দোকানদারের চেয়ে বেশি পরিচিতি একজন ভরসার মানুষ, নির্ভরতার ঠিকানা, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক নীরব সহযাত্রী হিসেবে।
বছরের পর বছর ধরে এই ছোট্ট দোকানেই জমে আছে অসংখ্য ক্লাসনোট, থিসিস, পরীক্ষার উদ্বেগ, আড্ডা আর তরুণ বয়সের অগণিত স্মৃতি। যেন জব্বার মোড়ের সেই দোকানটি কেবল কাগজ ছাপে না, ছাপিয়ে রাখে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্পও।
২০১০ সাল থেকে জব্বার মোড়ে ফটোকপি ও কম্পিউটারের ব্যবসা করে আসছেন তিনি। বাড়ি ময়মনসিংহের সুতিয়াখালী এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এই ছোট দোকানটিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও স্বপ্নের কেন্দ্র। দোকান সামলানোর পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে গেছেন সমানতালে। আনন্দমোহন কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এই ব্যবসার আয় দিয়েই তিন ভাইবোনের লেখাপড়া, ছোট বোনের বিয়ে এবং পরিবারের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০১৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে।
স্বপনের ভাষায়, “এই দোকানের টাকাতেই আমরা তিন ভাইবোন লেখাপড়া করছি। বাবার মৃত্যুর পরে পরিবার চালানোও আমার দায়িত্ব হয়ে যায়।”
দীর্ঘ ১৬ বছরের এই পথচলায় স্বপন এখন যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনানুষ্ঠানিক একাডেমিক সহকারী। কোন বিভাগের কোন শিক্ষক কী পড়ান, কোন টপিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোন কোর্সে কী ধরনের নোট প্রয়োজন এসব যেন মুখস্থ তাঁর। স্নাতক থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের নানা কোর্সের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাঁর ধারণা দেখে অনেকেই বিস্মিত হন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন এত শিক্ষার্থী আসে, সবাই বিভিন্ন নোটের নাম বলে। শুনতে শুনতে এখন কোন স্যার কী পড়ায়, কোন টপিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই মুখস্থ হয়ে গেছে।’
স্বপনের দোকানে শুধু ফটোকপি নয়, কম্পিউটারসংক্রান্ত প্রায় সব ধরনের কাজই করা হয়। করোনার আগে পর্যন্ত দোকানের নাম ছিল বৈশাখী কম্পিউটার অ্যান্ড ফটোস্ট্যাট’, করোনার পরে নাম পরিবর্তন করা হয়। থিসিস টাইপিং, কারেকশন, ইভ্যালুয়েশন কপি, হার্ডবাইন্ডিং, সিডি-ডিভিডি প্রস্তুত সবই এখন দক্ষতার সঙ্গে করেন তিনি। অথচ শুরুতে কম্পিউটারের কাজ তেমন জানতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সহায়তা নিয়েই ধীরে ধীরে শিখেছেন এসব কাজ।
শাহজালাল হলের এক শিক্ষার্থী তালহার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তালহা ভাই আমাকে বিভিন্ন প্রোগ্রামের কাজ শিখাইছে। আবার প্যাথলজি বিভাগের মুশফিক ভাইও অনেক সাহায্য করছে। এই ক্যাম্পাসে কাজ করতে করতেই শিখছি।”
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজে নিজে শেখা এই দক্ষতা এখন তাঁর ব্যবসার বড় শক্তি। তিনি বলেন, “কোনো সার্টিফিকেট নাই, কোনো কোর্স করি নাই। কিন্তু এখন থিসিসের প্রায় সব কাজ ঠিকঠাক করতে পারি।”
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে স্বপনের দোকানটি শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, অনেকটা আড্ডা ও ভরসার জায়গাও হয়ে উঠেছে। ক্লাস শেষে অসংখ্য শিক্ষার্থী সেখানে এসে নোট নেয়, প্রিন্ট করে, গল্প করে। আর এই নিয়মিত যোগাযোগ থেকেই শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার কথাও জানতে পারেন তিনি।
অনেক শিক্ষার্থীর আর্থিক সমস্যার কথা তুলে ধরে স্বপন বলেন, “অনেক সময় বড় ভাই বা সিনিয়ররা বলে দেয়, অমুকের ফ্যামিলি সমস্যা আছে। তখন আমি শুধু খরচটা রাখি, লাভ রাখি না। অনেক সময় বিনা পয়সায় কাজ করে দেই।”
করোনাকাল ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুরো ব্যবসাই প্রায় থেমে যায়। ক্লাস অনলাইনে শুরু হলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নোট ও প্রিন্টিং সমস্যায় পড়ে। তখনই নতুনভাবে চিন্তা শুরু করেন স্বপন।
তিনি বিভিন্ন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পিডিএফ সংগ্রহ করে পুরো সেমিস্টারের নোট প্রিন্ট করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কুরিয়ারে পাঠানো শুরু করেন। অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে এক পৃষ্ঠা প্রিন্ট করতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত লাগত, সেখানে তিনি ডেলিভারি অর্ডার পেয়ে দেড় টাকায় করে শিক্ষার্থীদের কাছে নোট পৌঁছে দিয়েছেন। স্বপন বলেন, “করোনার সময় ভাবলাম, অনেক শিক্ষার্থী গ্রামের বাড়িতে আছে। ওদের কাছে নোট পৌঁছানো দরকার। তাই কুরিয়ারে পাঠানো শুরু করি।”
করোনার পর কাগজের বাজারে বড় পরিবর্তন আসে। এলসি জটিলতা ও আমদানি সমস্যার কারণে কাগজের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। আগে যে কাগজের রিম ১৭০ টাকা ছিল, তা বেড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে যায়। ৮০ জিএসএম কাগজের দামও ৪০০ টাকার বেশি পৌঁছে যায়। পরে ব্যবসায়ী সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি পৃষ্ঠা ফটোকপির দাম দুই টাকা নির্ধারণ করা হয়।
তবে এই বাড়তি দামেও লাভ খুব বেশি থাকে না বলে জানান স্বপন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি পৃষ্ঠায় প্রায় ১ টাকা ৫৮ পয়সা খরচ হয়ে যায়। লাভ থাকে মাত্র ৪২ পয়সা।
তিনি বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন থেকেই ফটোকপির রেট কম রাখা হয়। লাভ কম, কিন্তু কাজ বেশি। শিক্ষার্থীদের কারণেই ব্যবসাটা টিকে আছে।”
বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশতে মিশতে স্বপনের সঙ্গে গড়ে উঠেছে এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাবেক শিক্ষার্থী এখন শিক্ষক হয়েছেন, কেউ চাকরি করছেন দেশের বিভিন্ন জায়গায়। তবুও তাঁরা খোঁজ নেন তাঁর। স্বপন গর্ব করে বলেন, “অনেক ভাই এখন স্যার হইছে। তারপরও ফোন দেয়, দোকানে আসে, খোঁজ নেয়।”
এই সম্পর্কের একটি মজার অভিজ্ঞতার কথাও শোনান তিনি। একদিন কেমিস্ট্রি বিভাগের একজন শিক্ষক তাঁর দোকানে এসে বিভিন্ন কোর্সের নোট সম্পর্কে জানতে চান। তখন স্বপন সাবলীলভাবে বলতে শুরু করেন কোন শিক্ষক কোন বিষয় পড়ান। তিনি বলেন, “আমি বলছিলাম মহিউদ্দীন স্যার পেস্টিসাইড কেমিস্ট্রি পড়ায়, ফরহাদ কাদির স্যার প্ল্যান্ট নিউট্রিশন পড়ায়, আখতার স্যার ফুড অ্যাডাল্টারেশন আর এনভায়রনমেন্টাল কেমিস্ট্রি পড়ায়।” এরপর ওই শিক্ষক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “আখতার স্যার তো নোট দেন না, তাহলে পাও কোথায়?” স্বপন উত্তর দেন, “অনেক শিক্ষার্থী স্লাইড টাইপ করে, নিজে লিখে বা ছবি তোলে। সেগুলো এডিট করে আমি নোট বানাই।” পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে ওই ব্যক্তিকে সালাম দিলে স্বপন বুঝতে পারেন, যাঁর সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছিলেন, তিনি নিজেই আখতার স্যার। ঘটনার পর ওই শিক্ষক নাকি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মজা করে বলেছিলেন, “একজন ফটোকপি দোকানদারের যদি বাকৃবির এগ্রিকালচারের সিলেবাস মুখস্থ থাকে, তাহলে তোমাদের থাকবে না কেন?”
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ সময়ের স্মৃতিতে শুধু হাসি বা সংগ্রামের গল্পই নেই; আছে রাজনৈতিক অস্থিরতার স্মৃতিও। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ছাত্ররাজনীতির সংঘর্ষ, মারামারি ও সহিংসতার নানা ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছেন স্বপন। বিশেষ করে ২০১৩ সালের একটি ঘটনার কথা এখনো নাড়া দেয় তাঁকে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে রেললাইনের দুই পাশে গোলাগুলির ঘটনায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। শিশুটি তার দাদির সঙ্গে খড়ি-লাকড়ি কুড়াতে এসেছিল বলে জানান তিনি। স্বপনের ভাষায়, “ওই বাচ্চাটা গোলাগুলির মধ্যে পড়ে মারা যায়। ঘটনাটা খুব কষ্টের ছিল।” পরে ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন বয়রা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মালেক। সেই প্রতিবাদের জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। স্বপন বলেন, সে সময় ক্যাম্পাসজুড়ে অস্থিরতা ছিল, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ অনেক বদলেছে।
এত দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যবসা করতে করতে ক্যাম্পাসটিকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবেই ভাবেন তিনি। তাই ব্যবসার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্নও দেখছেন। ছোট পরিসরে একটি গরুর খামার শুরু করেছেন। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি বলেন, “আস্তে আস্তে বড় করার ইচ্ছা আছে। কৃষির দিকেও মনোযোগ দিতেছি।”
বাকৃবির হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে ‘স্বপন ভাই’ শুধু একজন ফটোকপি দোকানদার নন। তিনি অনেকের কাছে ভরসা, থিসিসের সহকারী, আবার কারও কাছে ভাইয়ের মতো একজন মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, থিসিস আর স্মৃতিময় দিনগুলোর সঙ্গে নীরবে জড়িয়ে আছেন তিনি।
জব্বার মোড়ের ছোট্ট সেই দোকানটিতে প্রতিদিন নতুন শিক্ষার্থীরা আসে, পুরোনোরা ফিরে যায়। কিন্তু ক্যাম্পাসের ব্যস্ততার ভিড়ে ‘স্বপন কম্পিউটার অ্যান্ড ফটোস্ট্যাট’ যেন থেকে যায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক চেনা, নির্ভরতার গল্প হয়ে।
ভিওডি বাংলা/আরাফাত হোসাইন/আ







