হামের পরিসংখ্যানে শুভঙ্করের ফাঁকি, মৃত্যুঝুঁকিতে হাজারো শিশু

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাড়ে চার মাসে সারা দেশে হাম আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরকারি এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ চিত্র। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য—যা পরিকল্পিত ‘ডাটা ক্রাইসিস’ বা তথ্য গোপনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলতি বছর হামে মৃতের সংখ্যা নগণ্য। তবে, রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে আসা শিশুদের মধ্যে যারা মারা গেছে, তাদের অধিকাংশের মৃত্যুসনদে সরাসরি ‘হাম’ শব্দটি লেখা নেই। বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘সেপ্টিসেমিয়া’ বা ‘একিউট রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিন্ড্রোম (এআরডিএস)’ উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত মৃত্যুর হিসাব সরকারি ‘হাম ডাটাবেস’-এ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না।
অন্যদিকে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ৯৫ শতাংশ সফলতার দাবি করা হলেও— চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগান এবং ঢাকার কয়েকটি বস্তি এলাকায় দেখা গেছে, অনেক অভিভাবকের কাছে টিকা কার্ড থাকলেও তারা স্বীকার করেছেন যে, মাঠকর্মীরা বাড়িতে এসে টিকা না দিয়েই কার্ডে টিক চিহ্ন দিয়ে গেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন টিকাদান কর্মী বলেন, আমাদের ওপর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ থাকে। অনেক সময় দুর্গম এলাকায় যেতে না পারলে বা বাবা-মা অনাগ্রহী হলে আমরা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে কাগজে-কলমে কাজ শেষ করি।
এই জালিয়াতি শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে খাতা-কলমে নিরাপদ দেখালেও বাস্তবে তাদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হাম কেবল সর্দি-জ্বর বা শরীরে গুটি ওঠা নয়। এটি শিশুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেমকে পরবর্তী ৬ মাস থেকে ১ বছরের জন্য সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু রোগ বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, আমরা কেবল হামের প্রকোপটুকু গণনা করি। কিন্তু হাম থেকে সুস্থ হওয়ার তিন মাস পর যখন একটি শিশু সাধারণ নিউমোনিয়া বা পুষ্টিহীনতায় মারা যায়, তখন কেউ আর সেটিকে হামের প্রভাব হিসেবে দেখে না।
এই ‘পোস্ট-মিজলস’ বা হাম পরবর্তী মৃত্যুর ট্র্যাজেডি নিয়ে দেশে কোনো কেন্দ্রীয় গবেষণা বা ডাটাবেস নেই— এতে সংক্রমণের প্রকৃত মাত্রা আড়াল হচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আমরা জেলা পর্যায়ে সার্ভেইল্যান্স জোরদার করেছি। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকায় টিকা-বিমুখতা এবং তথ্য আদান-প্রদানের ত্রুটির খবর আমাদের কাছে এসেছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কেবল রুটিন টিকাদান যথেষ্ট নয়। যেসব এলাকায় শিশুদের ‘কাগজে-কলমে’ টিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে পুনরায় ‘ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ করা জরুরি।
ভিওডিবাংলা/সম্রাট/এফএ







