• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

সব চরিত্র কাল্পনিক নয়

   ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ০৪:৪৯ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

বইমেলার নবম দিন রোববার। শুক্র শনিবারের তুলনায় অনেকটাই হালকা পাতলা। ভিড় নেই একেবারেই। তবে দর্শনার্থীর চেয়ে পাঠকের সংখ্যা মনে হয় বেশি। যারা এসেছেন বই নেড়েচেড়ে দেখছেন। ছোট ছোট জটলায় লেখক প্রকাশকদের আড্ডা চলছে বিভিন্ন জায়গায়। চাইলে কোনো একটা আড্ডায় ঢুকে যাওয়া যায়। কিন্তু আমার একা একা ঘুরতে বেশি ভালো লাগে। কোলাহলের মধ্যেও নির্জন থাকার আলাদা মজা আছে। অনেক মানুষের ভিড়ে দলবদ্ধ থাকার চেয়ে মাঝে মাঝে একা থাকা অন্যরকম অনুভূতি দেয়। হাঁটতে হাঁটতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূব দিকে ঝাঁকড়া বট গাছটার নিচে এসে দাঁড়াই। 

বইমেলার এক মাস জুড়ে ভীষণ কোলাহল থাকে গাছটাকে ঘিরে। তারপর বাকিটা সময় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে নিঃসঙ্গ। একবার আমি মেলার সময় ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে বসেছিলাম এই গাছের নিচে। দূরে গ্লাস টাওয়ারের জলে ছিন্নমূল শিশুদের ঝাপাঝাপি দেখছিলাম। বয়স্ক ভবঘুরে মানুষরা কেমন কেমন চোখে তাকাচ্ছিলেন আমার দিকে। একটু পর ফ্লাস্কে করে চা বিক্রেতা এসে হাঁটছিলেন আমাকে ঘিরে। সবার চোখে ছিলো কৌতুহল। অথচ উদ্যানের ভেতরে তখন এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন অনেক মানুষ। অথচ আমাকে নিয়েই তাদের কেন এতো কৌতুহল ছিলো,কে জানে?
—    দোস্ত কেমন আছিস? কেউ একজন পেছন ধরে আমাকে!
তাকিয়ে দেখি রঞ্জন। ইশ কত বছর পর রঞ্জনের সঙ্গে দেখা!
—    তুই কোত্থেকে দোস্ত?
—    সোজা চিলাহাটি থেকে!
—    চিলাহাটি? ওখানে কি করিস তুই?
—    আমার পোস্টিং এখন সেখানে?
—    ওহ তাই বল!
—    তারপর কতদিন পর আমাদের দেখা হলো বলতো!
—    কতদিন না কত বছর পর তাই বল! আমার কথা শুনে হাসে রঞ্জন।

রঞ্জন আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সঙ্গে পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই ওর সঙ্গে পরিচয় কোচিং করতে গিয়ে। তারপর দুজনে ভর্তি হলাম ইউনিভার্সিটিতে। কি উত্তাল উচ্ছ্বল দিন ছিলো আমাদের! বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সবারই এমন থাকে নিশ্চয়। তবে আমরা ভাবি আমাদেরটাই সবচেয়ে আনন্দে ভরা। হয়তো সবাই তাই ভাবে!
—    কি হইলো কি ভাবছিস অতো? রঞ্জন উঁচুঁ গলায় বলে।
—    দোস্ত তোর মনে আছে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলার সময় আমরা পুরান ঢাকায় গিয়াসের বাসায় থাকতে গিয়েছিলাম এক রাতে?
—    ওই রাতের কথা আর বলিস না দোস্ত।
রঞ্জন বলতে মানা করলেও, আমার বলতে ইচ্ছে করছে খুব।

গিয়াস নিমতলীর কাছে তার ভাইয়ের বাসায় থাকতো। একদিন পরীক্ষা শেষে বলে, আজকে ভাবি বাসায় নাই। শুধু ভাইয়া আছে। তাও রাত এগারোটা বারোটার আগে আসবেন না। চল আজকে সবাই আমাদের বাসায় সারারাত আড্ডা দিবো! সেটি ছিলো বৃহস্পতিবার রাত।
—    রাতে কি খাওয়াবি ? আমাদের মধ্যে কে যেন বলেছিলো !
—    পুরান ঢাকার কাচ্চি বোল খাওয়াবো।
—    বোল মানে?
—    আরে বেটা আস্ত বোলে করে কাচ্চি বিক্রি হয় আমাদের ওখানে। এক বোল কাচ্চি নিলে সবাই মিলে খেয়ে শেষ করতে পারবি না।
—    কাচ্চির কথা শুনে আমরা রাজি হই তার সঙ্গে যেতে।

সন্ধ্যার পর থেকে রাজা উজির মারা আড্ডা চলতে থাকে গিয়াসের বাসায়। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কোনো আলাপ তোলে না সে। এদিকে ক্ষুধায় আমাদের পেট চো চো করছে। এক পর্যায়ে বলেই ফেলি খাওয়ার কথা।
—    দোস্ত তোর বোল কোথায়?
—    কিসের বোল? গিয়াস যেন আকাশ থেকে পড়ে!
—    আরে বেটা তুই না কাচ্চি খাওয়াবি বলে আমাদের নিয়ে এলি।
—    ওহ আচ্ছা। এবার যেন কিছুটা হুঁশে আসে গিয়াস।
সবাই বের হই খাবারের খোঁজে।  গিয়াস দেখি ইতিউতি কি জানি খোঁজে।
—    কি রে বেটা রেস্টুরেন্ট কোথায়?
গিয়াস কোনো কথা বলে না। একটু মনমরা ভাব ।
—    দোস্ত ওই দেখ বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। চল ঢুকে পড়ি আমরা। রাস্তার ধারের একটা কমিউনিটি সেন্টারের দিকে ইঙ্গিত করে গিয়াস।
তার কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে আমাদের সবার।
—    দোস্ত আসলে হয়েছে কি, তোদের যে খাওয়াবো আমার কাছে কোনো টাকা নেই। কৈফিয়তের সুরে বলে বলে গিয়াস।
—    টাকা নাই তাইলে আমাদের আনলি ক্যান? রেগে উঠে নাজমুল।
সে রাতে পরে আমরা কিভাবে খেয়েছিলাম সে গল্প তোলা থাকলো আরেক দিনের জন্য।
—    তারপর কেমন চলছে তোর? প্রশ্ন করে রঞ্জন।
—    এই তো আছি। বেশ ভালো আছি।
—    লেখালেখি কেমন চলছে?
—    ভালোই। দোস্ত তোর ক্যাম্পাসের কথা মনে আছে?
—    মনে থাকবে না কেন? কি বলিস!
—    মনে আছে বৃষ্টি নামলেই দলবেধে ভিজতাম। একবার ধানমন্ডি চার নম্বরের ওখানে একটা গাড়ি বৃষ্টির পানি ছিটিয়ে রিফাতের শরীরে। আর এনিয়ে তার সে কি চোটপাট গাড়িওলায়ার সঙ্গে। অথচ আমরা তখন মুষলধারা বৃষ্টিতে ভিজছি। সেই ময়লা পানি হয়তো বৃষ্টিতে ধুয়ে যাবে। তবুও কেন সে এতো রাগ করেছিলো কে জানে!
—    আসলে দোস্ত তখন সময়টাই ছিলো অন্যরকম। অকারণেই খুব একরোখা আর জেদি ছিলাম আমরা।
—    হুম, সেটাই। আমরা যে প্রায়ই ক্যাম্পাস থেকে ভ্যানে করে স্টার কাবাবে কাচ্চি খেতে যেতাম সেটা মনে আছে।
—    আছে সব মনে আছে। আমার বিভিন্ন গল্পে ক্যাম্পাসের যেসব বর্ণণা দিই সেগুলো তো মূলত আমাদেরই গল্প।
—    ওহ, আমার তো মনেই থাকে না তুই যে লেখক মানুষ।
এলোমেলো নানা বিষয়ে এগিয়ে চলে আমাদের কথা। অনেক দিন পর দেখা হলে যা হয়, ঘুরেফিরে শুধু পুরনো আলাপই আসে। আলাপে সময় গড়ায়। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা আসে ধীর পায়ে হেঁটে।
—    তুই কি আমার সঙ্গে কথা বলেই সময় কাটিয়ে দিবি? মেলা ঘুরে দেখবি না? রঞ্জনকে বলি আমি।
—    ঢাকায় আছি কয়েক দিন। মেলায় আরো ঘুরতে পারবো। তোকে তো আর পাবো না।
—    আমি আসি প্রতিদিনই। অল্প সময়ের জন্য হলেও।
—    দোস্ত চল, কোথাও বসি। একটু চা খাওয়া।
—    এখানে চা পাওয়া যায় না রে বন্ধু। শুধুই কফির দোকান।
আমরা দুজন হেঁটে মেলার একেবারে উত্তরপ্রান্তের কফির দোকানে যাই। খুব বেশি মানুষ নেই আজ। দুইকাপ কফি নিয়ে গ্লাস টাওয়ারের লেকের রেলিংয়ে বসি। দুজনে নীরবে কফি খাই। আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ।

[নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। ভিওডি বাংলা সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, ভিওডি বাংলা কর্তৃপক্ষের নয়] 

ভিওডি বাংলা/এম 


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়