রাজশাহী সিটি পশুহাটে দুর্ভোগ চরমে, কোটি টাকার রাজস্বেও নেই উন্নয়ন

রাজশাহীর অন্যতম বৃহৎ পশুর হাট সিটি বাইপাস পশুহাট। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতি সপ্তাহে এখানে আসে হাজার হাজার গরু, মহিষ ও ছাগল। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এই হাটে বেচাকেনার পরিমাণ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত পড়ে আছে এই পশুহাট। ফলে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগে পড়ছেন ক্রেতা, বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।
হাটে নেই পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা। সামান্য বৃষ্টিতেই জমে যায় হাঁটুসমান পানি। কাদামাটি আর দুর্গন্ধে ভরে ওঠে পুরো এলাকা। অন্যদিকে প্রচণ্ড রোদে ধুলাবালির কারণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। ক্রেতা-বিক্রেতাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হলেও হাটের উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
রোববার (১০ মে) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পশুহাটের ভেতরে নেই কোনো স্থায়ী গণশৌচাগার। নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থাও অপ্রতুল। ব্যবসায়ীদের বসার জন্য নেই নির্দিষ্ট জায়গা কিংবা আধুনিক অফিসঘর। এমনকি পশুহাটে নামাজ আদায়ের জন্য মানসম্মত মসজিদও নেই বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দালালদের ভাষ্য, একটু বৃষ্টি হলেই পুরো হাট কাদায় একাকার হয়ে যায়। পশু নিয়ে চলাচল করা যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি ক্রেতাদেরও ভোগান্তি বাড়ে কয়েকগুণ। বর্ষা মৌসুমে অনেক সময় হাটে হাঁটাই দায় হয়ে পড়ে।
মোহনপুর এলাকার পশু ব্যবসা সমন্বয়কারী ফজলুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই হাটে আসছি। দেশের অনেক পশুহাট দেখেছি, কিন্তু এমন দুরবস্থা খুব কম জায়গায় দেখা যায়। এখানে ভালো রাস্তা নেই, শৌচাগার নেই, নামাজ পড়ারও ঠিকঠাক ব্যবস্থা নেই। অথচ সরকার এই হাট থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করছে।”
তিনি আরও বলেন, “গরমের সময় ধুলাবালি আর বর্ষায় কাদা-দুই অবস্থাতেই ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।”
হাট ঘুরে দেখা যায়, পাশের ভাগাড়ের দুর্গন্ধ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। স্থানীয়দের অভিযোগ, পশুর বর্জ্য, কাদা ও ময়লার কারণে পুরো এলাকা অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, “খরার সময় ধুলাবালিতে শ্বাসকষ্ট হয়, আবার বৃষ্টির সময় গোবর ও ময়লা পানির মধ্যে চলাচল করতে হয়। এতে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি সমস্যায় পড়েন।”
তার দাবি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পশুহাট থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় হলেও উন্নয়ন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। অনেকেই মনে করেন, হাটের আয়ের একটি অংশ নিয়মিত উন্নয়ন কাজে ব্যয় হলে বর্তমান দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা নমির উদ্দিন বলেন, “হাটের আয় থেকে উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। যদি নিয়মিত উন্নয়ন করা হতো, তাহলে রাস্তা, ড্রেন, মসজিদ ও শৌচাগারের এমন অবস্থা থাকতো না।”
তিনি আরও বলেন, আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে হাটের পরিধিও বাড়ানো সম্ভব হতো এবং ব্যবসায়ীরাও স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারতেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরে সিটি বাইপাস পশুহাটের ইজারা মূল্য প্রায় আট কোটি সাত লাখ টাকা। ট্যাক্স ও ভ্যাটসহ মোট রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি আট লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
এত বিপুল রাজস্ব আদায়ের পরও হাটে মৌলিক সুবিধার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দ্রুত স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে কোরবানির ঈদে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
বর্তমান ইজারাদার শওকত আলী বলেন, “হাটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা ও পানি জমে যায়। এতে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “গণশৌচাগার, ভালো রাস্তা, মানসম্মত মসজিদ, অফিসঘর ও হাছিল ঘর অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।”
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে দ্রুত উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা। তাদের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ এই পশুহাটে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ভিওডি বাংলা/রমজান আলী/জা







