জাল সনদে চাকরি:
মাদ্রাসা ও কারিগরির ২৬২ শিক্ষক-কর্মচারী শনাক্ত

বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদে চাকরি করা ২৬২ শিক্ষক-কর্মচারীকে শনাক্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। তাদের বিরুদ্ধে এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) সুবিধা স্থগিত, মামলা দায়ের এবং বেতন-ভাতার নামে সরকারি তহবিল থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সোমবার ডিআইএ এ-সংক্রান্ত একটি তালিকা কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠিয়েছে। চিঠির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন প্রতিবেদন, জাল বা ভুয়া সনদের কপি এবং সনদ যাচাইয়ের পর সনদ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের পাঠানো নথিপত্রও সংযুক্ত করা হয়েছে।
ডিআইএ সূত্রে জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া ২৬২ জনের মধ্যে ২৫১ জন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) জাল সনদ ব্যবহার করে শিক্ষকতা করছেন বা করতেন। বাকি ১১ জনের বিরুদ্ধে বিপিএড, বিএড, গ্রন্থাগার বিজ্ঞানসহ অন্যান্য শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জাল করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এসব জাল সনদধারীর কাছ থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ফেরত আদায় করা সম্ভব হতে পারে। এর মধ্যে শুধু এনটিআরসিএর জাল সনদ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেই প্রায় ৪৮ কোটি টাকার বেশি আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, অন্যান্য ভুয়া সনদ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ফেরত পাওয়া যেতে পারে।
ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন এবং অভিযুক্তদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ডিআইএর পাঠানো তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে খুব শিগগিরই মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে পৃথক নির্দেশনা পাঠানো হবে। সেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
এর আগে স্কুল ও কলেজ পর্যায়েও জাল সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে ৪৭১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত জাল সনদে চাকরি করা শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪৯ জনে।
ডিআইএ সূত্র বলছে, ২০১২ সাল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদ শনাক্তে কার্যক্রম শুরু হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের শুরুতে স্কুল-কলেজের ৬৭৮ জন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা পর্যায়ের প্রায় ২০০ জন জাল সনদধারীর তালিকাও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
সেসময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, এমপিও স্থগিত এবং বেতন-ভাতা ফেরত আদায়ের মতো ব্যবস্থা নেয়। তবে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। ফলে আদালতে মামলা চলমান থাকায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া আটকে যায়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাল সনদ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন চাকরি করা শুধু প্রতারণাই নয়, এটি শিক্ষাব্যবস্থার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও বড় হুমকি। তারা মনে করছেন, জাল সনদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম কমে আসবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, জাল সনদ শনাক্তকরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে এবং ভবিষ্যতে নিয়োগের আগে সনদ যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হবে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অযোগ্য বা প্রতারণার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রবেশ রোধ করা সম্ভব হবে।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







