• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

জলাতঙ্ক:

প্রাণঘাতী ভাইরাস, সচেতনতাই একমাত্র সুরক্ষা

লাইফস্টাইল    ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩৪ পি.এম.
কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের মাধ্যমে ছড়ানো জলাতঙ্ক প্রতিরোধে দ্রুত চিকিৎসা ও টিকা গ্রহণ জরুরি: ছবি: সংগৃহীত

দেশে একের পর এক নতুন রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ডেঙ্গু, হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের আতঙ্কের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ যার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগীকে বাঁচানোর সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে রোগটি নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সময়মতো সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।

জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে র‌্যাবিস নামে পরিচিত। এটি মূলত প্রাণিবাহিত একটি সংক্রমণ, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। রোগটির একটি ভয়াবহ বৈশিষ্ট্য হলো-লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে।

অনেকেই একে “পাগলা রোগ” নামেও চেনেন। আক্রান্ত ব্যক্তি পানি দেখলে বা পানির কথা ভাবলেই তীব্র ভীতি ও আতঙ্ক অনুভব করেন-এই অবস্থাকেই বলা হয় হাইড্রোফোবিয়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০ মিনিটে একজন মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান। বছরে প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ এই রোগে প্রাণ হারান। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রতিবছর আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ জন মানুষ জলাতঙ্কে মৃত্যুবরণ করেন। শুধু মানুষ নয়, দেশের হাজার হাজার গবাদিপশুও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে।

জলাতঙ্ক ছড়ায় মূলত আক্রান্ত প্রাণীর লালার মাধ্যমে। কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি ও বানরের মতো প্রাণী এই ভাইরাস বহন করতে পারে। তবে বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কুকুরই প্রধান বাহক।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্কের ঘটনা কুকুরের কামড়ের কারণে ঘটে। আক্রান্ত প্রাণীর লালায় থাকা ভাইরাস কামড়, আঁচড় বা ক্ষতস্থানের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

ভাইরাসটি স্নায়ুর মাধ্যমে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং সেখানে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়। সাধারণত কামড়ের ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে এটি এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্ত দেরিতেও প্রকাশ পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। কারণ শিশুরা অনেক সময় অচেনা বা রাস্তার কুকুরের সঙ্গে খেলা বা যোগাযোগ করে।
এছাড়া পশুপালনকারী, ভেটেরিনারি কর্মী, চিড়িয়াখানার কর্মী এবং কুকুর-বিড়াল পোষা ব্যক্তিরাও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন।

জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ও আচরণে একাধিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-অস্বাভাবিক আচরণ ও বিভ্রান্তি, অকারণে ঘুরে বেড়ানো, খাবারের প্রতি অনীহা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন বা কর্কশ হয়ে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ ও আক্রমণাত্মক আচরণ, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, খিঁচুনি ও দুর্বলতা ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো পানির প্রতি তীব্র ভয়। পানি দেখলে বা শুনলেই রোগী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

র‌্যাবিস ভাইরাস একবার স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে গেলে তা মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ধ্বংস করতে শুরু করে। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণ প্রকাশের পর রোগী সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন।

জলাতঙ্কের নির্দিষ্ট কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। তবে প্রতিরোধমূলক টিকা জীবন বাঁচাতে পারে।

প্রাণী কামড়ানোর পর দ্রুত টিকা গ্রহণ করলে ভাইরাস শরীরে স্থায়ী হতে পারে না। সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী একাধিক ডোজ টিকা নিতে হয়-যেমন ০, ৩, ৭, ১৪, ২৮ এবং ৯০তম দিনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত টিকা নেওয়া যাবে, তত বেশি নিরাপদ থাকা সম্ভব।

সবাইয়ের টিকা প্রয়োজন না হলেও কিছু গোষ্ঠীর জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি-পশুচিকিৎসক, কুকুর-বিড়াল পালনকারী, গ্রামীণ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী, চিড়িয়াখানার কর্মী ও প্রাণীর সংস্পর্শে নিয়মিত কাজ করেন এমন ব্যক্তি।

এছাড়া উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণকারীদেরও প্রতিরোধমূলক টিকা গ্রহণ করা উচিত।

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কেবল মানুষের টিকা নয়, প্রাণীদের টিকাদানও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কুকুর ও বিড়ালের নিয়মিত টিকাদান করলে ভাইরাসের বিস্তার অনেকাংশে কমে যায়।

প্রাণী কামড়ালে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জীবনরক্ষাকারী হতে পারে। করণীয়গুলো হলো-ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা, প্রবহমান পানি দিয়ে অন্তত ১০ মিনিট ক্ষত ধোয়া, সাবান ব্যবহার করা, দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়া ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিসেপটিক ও টিকা গ্রহণ।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ক্ষতস্থানে ঝাড়ফুঁক, চিনি, লবণ ও বরফ বা কোনো অপচিকিৎসা ব্যবহার করা উচিত নয়।

জলাতঙ্ক কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটি প্রতিরোধযোগ্য হলেও অবহেলা করলে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। সঠিক সময়ে টিকা, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রাণীর প্রতি সতর্ক আচরণই এই রোগ থেকে সুরক্ষার মূল উপায়। 

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
গরমে সজনে ডাঁটা, স্বাদে-গুণে শরীর রাখে সতেজ
গরমে সজনে ডাঁটা, স্বাদে-গুণে শরীর রাখে সতেজ
কয়েক ধাপে সহজেই ঝলমলে বৈশাখী সাজ
কয়েক ধাপে সহজেই ঝলমলে বৈশাখী সাজ
অনন্য তুষার নীরবতায় আত্ম-আবিষ্কারের হিমাচল ভ্রমণ কাহিনি
অনন্য তুষার নীরবতায় আত্ম-আবিষ্কারের হিমাচল ভ্রমণ কাহিনি