রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র

রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের সংকট দিন দিন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সারাদেশের মতো রাজশাহীতেও দীর্ঘদিন ধরে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালক ও সাধারণ গ্রাহকরা। এক মাসের বেশি সময় ধরে এই পরিস্থিতি চললেও এখনো কার্যকর সমাধান না আসায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি না পৌঁছানোয় অধিকাংশ পাম্পে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এতে করে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি সারারাত অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
সরেজমিনে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, ট্রাক ও অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পাম্পগুলোতে সিরিয়াল কয়েকশ মিটার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হচ্ছে। অনেকে নির্দিষ্ট সময়ের কাজ বা ভাড়া রক্ষা করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
চালকরা জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে শুধু সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, বরং আয়-রোজগারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। গণপরিবহন ও ভাড়ায় চালিত যানবাহনের চালকদের দৈনিক আয় কমে গেছে অর্ধেকেরও বেশি। অনেকেই বাধ্য হয়ে গাড়ি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
একজন মোটরসাইকেল চালক ফরিদ উদ্দিন বলেন, “টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিন আগে ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র কয়েকশ টাকার তেল পেয়েছিলাম। এখন আবার একই অবস্থা। জানি না এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে।”
আরেক চালক রাব্বি অভিযোগ করে বলেন, “সরকার বলছে দেশে তেলের মজুত আছে, তাহলে আমরা কেন পাচ্ছি না? ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, কিন্তু তেল মিলছে না।”
ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, তারা চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে জ্বালানি পাচ্ছেন না। ফলে সীমিত সরবরাহের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজশাহীর একটি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক রাকিব হোসেন জানান, “আমরা যতটুকু তেল পাচ্ছি, ততটুকুই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। সরবরাহ কম থাকায় সবাইকে চাহিদামতো দিতে পারছি না।”
অন্যদিকে, আফরিন ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক ফারুক বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ জ্বালানি তারা এক সপ্তাহে বিক্রি করতেন, এখন তা একদিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ।
এদিকে ডিজেলের সরবরাহ তুলনামূলক কিছুটা বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দূরপাল্লার ট্রাক ও বাস চালকরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন। অনেক গাড়ি জ্বালানি না পেয়ে রাস্তায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কম ভাড়ায় যাত্রা করছে।
নওদাপাড়া ট্রাক টার্মিনালের এক চালক জসিম আলী জানান, জ্বালানির অভাবে তাকে একটি বড় ভাড়া ছেড়ে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “গাড়িতে তেল না থাকায় ১৬ হাজার টাকার ভাড়া নিতে পারিনি। এভাবে চললে পরিবার নিয়ে বাঁচা কঠিন হয়ে যাবে।”
রাজশাহী জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের নেতারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের বহরের বড় একটি অংশই অলস পড়ে আছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জানান, প্রায় অর্ধেকের বেশি গাড়ি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে, যা পরিবহন খাতে বড় ক্ষতি সৃষ্টি করছে।
ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডিপো থেকে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিতরণ কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগে যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হতো এখনো প্রায় একই পরিমাণ দেওয়া হচ্ছে। তবে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি সড়ক পথে অতিরিক্ত খরচে জ্বালানি পরিবহন করায় লজিস্টিক সমস্যাও তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের এই সংকট জনজীবন ও পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিওডি বাংলা/জা







