সুশাসন নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই: রিজভী

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে নিরপেক্ষ প্রশাসনের বিকল্প নেই। সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট ও অস্থিরতা তৈরি হয়, আর তখনই বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে ঐক্য ধরে রাখতে পারলে কোনো শক্তিই বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাজধানীর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি অডিটোরিয়ামে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি আয়োজনে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আলোচনা সভায় তিনি এ সব কথা বলেন।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল নয় মাসের যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।
তিনি বলেন, ১৭৫৭ সাল থেকে শুরু করে তারও আগে থেকে এ অঞ্চলের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা বারবার দমনের চেষ্টা হয়েছে। তবে প্রতিবারই মানুষ সংগ্রাম করেছে। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে দীর্ঘ বঞ্চনা, প্রতিরোধ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
তিনি বলেন, ভিয়েতনামের ইতিহাস তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন বিদেশি শাসন, যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে একটি জাতি কীভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, ভিয়েতনাম তার উদাহরণ। একটি জাতির স্বাধীনতার পেছনে যদি নিরন্তর সংগ্রামের পটভূমি থাকে, তবে সেই জাতি একসময় উন্নয়ন, আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
রিজভী বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নানা সময়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। কখনো এটিকে শুধু ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়, অথচ প্রকৃত সত্য হলো—এটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআরসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের ভেতর থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা উঠে এসেছিলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশে প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে এবং স্বাধীনতার ইতিহাসকে একমুখী করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেন স্বাধীনতার সব অবদান একটি পরিবার বা একটি গোষ্ঠীর; অন্য কারও কোনো ভূমিকা নেই। এতে জাতির আত্মাকে কলুষিত করা হয়েছে।
রিজভী বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তবে তরুণেরা সত্য বুঝতে পারছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার যে শক্তি, তা সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলাদা নয়। তাঁর মতে, তারুণ্যের ধর্মই হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।
স্বাধীনতার অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেলেই একটি জাতি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয় না। নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। বাংলাদেশে মানুষ এমন সময়ও পার করেছে, যখন কথা বলার স্বাধীনতা ছিল না, মতপ্রকাশের ওপর নজরদারি ছিল এবং বিরোধী মতকে দমন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মূল চেতনা হচ্ছে মানুষের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তাঁর মতে, একটি দল বা একজন নেতার কণ্ঠস্বরই যদি একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে সেটি গণতন্ত্র নয়। মানুষকে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে, যদি না তিনি সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কোনো অস্বাভাবিক অবস্থানে থাকেন।
রিজভী বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম যেমন বৃহৎ রাষ্ট্রিক পরিসরে হয়, তেমনি ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেও স্বাধীনতার চেতনা কাজ করে। একজন মানুষ যখন নিজের কথা বলতে পারেন, নিজের অধিকার দাবি করতে পারেন, তখনই তিনি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন। আর এই স্বাধীনতা রক্ষা করবে সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
তিনি বলেন, কেবল ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনই গণতন্ত্রের একমাত্র পরিচয় নয়। গণতন্ত্রকে টেকসই ও প্রাণবন্ত করতে হলে বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রশাসনকে শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ হতে হবে।
প্রশাসন প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, রাষ্ট্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনে নিরপেক্ষতা থাকতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘ওই ডিসি আমাদের লোক কি না, ওই বিভাগীয় কমিশনার কোন রাজনৈতিক দলের—এভাবে বিচার করতে গেলে বিভাজন চরমে পৌঁছাবে, আর শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র—দুটোরই অধঃপতন হবে।’
তিনি বলেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে মেধা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ব্রিটিশ আমলের কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আজও কার্যকর উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রিজভী বলেন, সুশাসন না থাকলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, জনগণের অর্থ লুটপাট হয়, তা বিদেশে পাচার হয়, আর তখনই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো হস্তক্ষেপের সুযোগ পায়। রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন তাকে ‘ফেইলড স্টেট’ বলার সুযোগও তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দেশের ভেতরে মতপার্থক্য থাকলেও একটি ঐকমত্য থাকা জরুরি। রাজনৈতিক মতভেদ, সমালোচনা বা বিরোধিতা থাকতে পারে; কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবাইকে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।
ইতিহাস রচনার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, যাঁর যেখানে অবদান, সেই অবদানের স্বীকৃতি দিয়েই দেশের ইতিহাস রচনা করতে হবে। ইতিহাসকে যদি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে বিভ্রান্তি ও বিভাজন কমবে। অন্যথায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চরিত্র নিয়েও অপপ্রচার চালানোর সুযোগ থেকে যাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এ দেশের মানুষের যুদ্ধ, পাকিস্তানি শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই। ভারতের সহযোগিতা ছিল, তবে যুদ্ধটি মূলত বাংলাদেশের মানুষেরই। তাঁর ভাষায়, ‘লড়াই তো করেছে আমাদের সেনাবাহিনী, আমাদের মানুষ, আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা।
ভিওডি বাংলা/সবুজ/আ







