• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

তারেক রহমান:

কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তব কাজেই দেশ এগিয়ে যাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক    ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:০৭ পি.এম.
খালিশপুরে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন তারেক রহমান-ছবি: সংগৃহীত

শুধু কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তব ও কার্যকর কাজের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে-এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে দেশ গড়তে হবে। একটি বা নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণিকে বাদ দিয়ে কখনোই টেকসই রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্ভব নয়।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে খুলনা মহানগরীর খালিশপুরের প্রভাতী স্কুল মাঠে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, “দেশের মানুষ এখন আর কথার রাজনীতি চায় না। তারা চায় বাস্তব কাজ, চায় সম্মান, চায় ভোটাধিকার। যারা শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে কিন্তু বাস্তবে মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি, জনগণ এবার তাদের জবাব দেবে।”

নারীদের মর্যাদা ও ভূমিকার ওপর জোর

বক্তব্যে নারীদের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি, যার অন্তত অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অবহেলা করে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল-নারীরা শিক্ষিত হয়ে আত্মনির্ভরশীল হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং দেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

তারেক রহমান বলেন, “যারা নারীদের অসম্মান করে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং যারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে-তারা কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না। নারীদের পেছনে রেখে দেশ এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা একেবারেই অবাস্তব।”

‘নারীবিদ্বেষী বক্তব্য’ নিয়ে কঠোর সমালোচনা

নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি রাজনৈতিক দলের বক্তব্যকে ‘নারীবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, একটি দল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে-তারা নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না। শুধু তাই নয়, ওই দলের এক নেতা কর্মসংস্থানে নিয়োজিত মা-বোনদের উদ্দেশে এমন কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা শুধু নারীদের নয়, পুরো জাতির জন্যই লজ্জাজনক।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের লক্ষাধিক নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। আবার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। অথচ আজ তাদেরই অপমান করা হচ্ছে-এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

ধর্মীয় প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তব্য

ধর্মীয় প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, “যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছে-নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। ইসলাম কখনোই নারীর কর্মজীবন বা আত্মমর্যাদাকে খাটো করে দেখেনি। কাজেই নারীদের কর্মসংস্থান নিয়ে কটূক্তি করার অধিকার কারও নেই।”

আইডি হ্যাক বিতর্কে অভিযোগ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) আইডি হ্যাকের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান অভিযোগ করেন, ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে একটি রাজনৈতিক দল ‘আইডি হ্যাক’-এর অজুহাত দাঁড় করিয়েছে।

তিনি বলেন, “বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন-এভাবে আইডি হ্যাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে মিথ্যাচার করে তারা নিজেদের আসল চরিত্রই প্রকাশ করছে।”

নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা

আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন ষড়যন্ত্র চলছে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, “একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বলছে-ভোট গণনায় অনেক সময় লাগবে। এর মাধ্যমে তারা নতুন ষড়যন্ত্রের পথ তৈরি করতে চায়। জনগণকে বিভ্রান্ত করাই তাদের লক্ষ্য।”

অতীতের নির্যাতনের বর্ণনা

গত ১৫-১৬ বছরে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর চালানো দমন-পীড়নের কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই সময়ে অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, “মানুষ ভোট দিতে পারেনি, কথা বলার চেষ্টা করলে রাতের আঁধারে তুলে নেওয়া হয়েছে। কেউ গুম হয়েছে, কেউ খুন হয়েছে। এই বাস্তবতা দেশের মানুষ ভুলে যায়নি।”

গণঅভ্যুত্থান ও ভোটাধিকার

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। এখন সময় এসেছে অধিকার আদায়ের।

তিনি বলেন, “আগামী ১২ তারিখে ইনশাআল্লাহ দেশের মানুষ সেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে, যা থেকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।”

উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি

বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন তারেক রহমান। এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

এ ছাড়া কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সহজেই ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক পাবেন। বর্তমানে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ রয়েছে, তা সুদসহ মওকুফ করা হবে বলেও জানান তিনি।

খুলনা অঞ্চলের উন্নয়ন

খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চল নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই অঞ্চলকে আবারও জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে।

তিনি বলেন, “নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। তরুণদের জন্য আইটি পার্ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে।”

জনসভার অন্যান্য আয়োজন

এর আগে সকাল সোয়া ১১টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা এবং সঞ্চালনা করেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন। কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা কাজী আবু রহীম।

জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-২ আসনের প্রার্থী ও সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-৫ আসনের আলি আসগর লবী, সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবীবসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
জামায়াত প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত
আমিনুল হক: জামায়াত প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত
নারীদের অধিকার রক্ষায় বিএনপি আপসহীন থাকবে: ইশরাক
নারীদের অধিকার রক্ষায় বিএনপি আপসহীন থাকবে: ইশরাক
নারীদের নিয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য লজ্জাজনক
সেলিমা রহমান: নারীদের নিয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য লজ্জাজনক