• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

জাতীয়তাবাদ নাকি ধর্ম? কে আগে কে পরে...

   ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৫:১২ পি.এম.

শাফাআত হিমেল

"আমি প্রথমে একজন মুসলিম, পরে একজন বাংলাদেশি।" বিগত কয়েক সপ্তাহের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের নানা ঘটনাচক্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আলোচনায় এমন কথা প্রায়ই উঠে এসেছে। অনেকের ক্ষেত্রে এর ঠিক বিপরীত কথাটিও প্রযোজ্য হতে পারে।

ধর্মের ভিত্তিতে ইংরেজ শাসকদের শাসন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়া এবং তার সঙ্গে পশ্চিম-পাকিস্তান থেকে ২২০০ কিলোমিটার দূরে তিনদিক থেকে ভারত বেষ্টিত পূর্ব-পাকিস্তান হওয়া কোনটিই দূরদৃষ্টি বিবেচনায় বাস্তবসম্মত ছিল না। কিন্তু তারপরও এই দেশভাগের আলোচনা উঠলেই আমাদের সবার প্রথমে যে কথাটি মনে হয় তা হলো ব্রিটিশদের "ডিভাইড এন্ড রুল" নীতি। অর্থাৎ জনগণ একসাথে থাকলে শাসকদের জন্য হুমকি মনে হতে পারে, তাই তাদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দিবেন। যেন জনগণ কখনও শাসকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হতে না পারে।

তবে শুধু ধর্মের কারণে পশ্চিম-পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলার সংযুক্তি যে কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত ছিল না তা প্রকাশ পায় ১৯৪৭ পরবর্তী ২৪ বছরের তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের উপর পশ্চিম-পাকিস্তানের অন্যায় অবিচারের শাসনের মাধ্যমে। ফলশ্রুতিতে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয় ১৯৭১ সালে। উদ্দেশ্য ছিল "জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা"-র ভিত্তিতে গঠিত একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু একের পর এক সেনা শাসন, স্বৈরশাসন, ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা সব মিলে দেশের মানুষের আর সেই সুদিন দেখা হয়ে উঠেনি।

তাই স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এসেও ২০২৪ সালে সবার আগে নিজের ধর্মীয় পরিচয় টেনে এনে তারপর বাংলাদেশি বলতে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের শ্রদ্ধা এবং তার সঙ্গে অস্তিত্বের যে সম্পর্ক তা কেন জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি? তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে দুটি বড় কারণ হতে পারে। এক, আমরা সকলের জন্য একটি অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। যে কারনে প্রায়ই একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী তার পাশের মহল্লার হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর কারও কষ্টে যতটুকু না ব্যথিত হন তার চেয়ে বেশি দুঃখ ভারাক্রান্ত হন ভারতের কাশ্মীরে কিংবা মায়ামারের মুসলমানদের নির্যাতিত হওয়ার খবরে। খুশি হন সিরিয়ার জনগণের স্বৈরাচার আসাদ সরকারের অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তিতে। অর্থাৎ নিজেদের জাতীয়তাবাদের আগেই চলে আসছে আমাদের ধর্ম পরিচয়। আমাদের আবেগ অনুভূতি নির্ধারিত হচ্ছে নির্যাতিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে।   

দুই, মুসলিম বিশ্বের সাংবিধানিক জটিলতা। গণতন্ত্র নাকি রাজতন্ত্র নাকি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র? দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য সহ অধিকাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ধর্মাবলম্বী অঞ্চলের দেশগুলোর একটি সাধারণ সাংবিধানিক ত্রুটি চোখে পরে তা হচ্ছে, সেখানকার জনসংখ্যার একটি অংশ নিজেদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বাইরে ধর্মীয় পরিচয় সামনে নিয়ে আসেন। অনেকে এখনও বিশ্বাস করেন হয়তো কখনো পুরো পৃথিবীতে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং খেলাফত হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম ধর্মের প্রচারে বড় ভূমিকা ছিল মধ্য এশিয়া থেকে আসা সুফি সাধকদের। তৎকালীন অত্যাচারী শাসকদের হাত রক্ষা পেতে এবং জাত-পাতের বিভাজন থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া মানুষকে যখন শোনানো হল ইসলামের শান্তির বাণী ও সকল মুসলিম পরস্পর ভাই ভাই, তখন দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। যে কারণে আজও বাংলার মানুষ ভাবেন "সকল মুসলিম ভাই ভাই"। নিজেদের আত্মার সাথে এক ধরনের সম্পর্ক খুঁজে পান মধ্যপ্রাচ্যের আরব কিংবা আফগানিস্তানের বাসিন্দাদের সঙ্গে।

কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্নই। খোদ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোই একে অপরের সাথে নানা ধরনের বিবাদের জড়িয়ে আছেন। সীমান্ত নিয়ে বিভেদ, জাতিগত বিভেদসহ আরও অনেক কিছু। নিজেদের অঞ্চলের বাইরে ইউরোপ, অ্যামেরিকাতেও অনেক প্রতিষ্ঠানে আরবী বিভাগে নিজেদের মধ্যে অন্তঃকলহ অন্য বিভাগের থেকে কিছু ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকে। এর কারণ কী? তাদের ধর্ম তো এক। কিন্তু তাদের মাঝে জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিস্তর ফারাক রয়েছে। যে কারণে অনেক সময় তাদের বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যেন কর্মক্ষেত্রে যে কোন ধরনের সংঘাত না তৈরি হয়। তাই আপনিও যখন তাদের সঙ্গে কাজ করবেন কখনো, দেখবেন তাদের থেকে আপনার ধর্ম চর্চার পদ্ধতিও ভিন্ন। সকল মুসলিম ভাই ভাই এই কথাটি সত্য প্রমাণিত না হতে পারে অনেকাংশে। কারণ আপনি যে রাষ্ট্রে জন্মেছেন, যেই সমাজে বড় হয়েছেন সেই সমাজ থেকে তাদের সমাজ পুরোপুরি আলাদা। 

তাই স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দেশ যখন ফ্যাসিস্ট মুক্ত হয়ে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন অন্তত আমাদের ধর্ম পরিচয়ের পাশাপশি নিজেদের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে একত্রিত হওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্র থাকার কারণেই আমরা এখনও এক হয়ে নতুনভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখতে পারছি। তাই কেউ যেন কারো ধর্মকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রে অরাজকতা তৈরি করতে না পারে, সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে নজর রাখা জরুরি। ধর্ম কারও থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু আমরা যদি বাংলাদেশি হিসেবে নিজেকে দেখার চেয়ে ধর্মের চোখে একে অপরকে দেখতে শিখি তাহলে শত্রুর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পরিচয়টিই পৃথিবীতে নতুনভাবে তৈরি হতে পারে। যা আপনার আমার অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলে দিতে পারে।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক        


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়