• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

আইআরজিসিতে মতবিরোধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক    ৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৭ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে নতুনভাবে সাজানোর আলোচনা দেশটির রাজনৈতিক মহলে জোরালো হয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক গবেষক মেহদি খোররাতিয়ানের এক মন্তব্যকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে- তেহরান কি আইআরজিসিকে ভেঙে নতুন কাঠামো গড়তে যাচ্ছে, নাকি এটি কেবল পুরোনো প্রতিষ্ঠানের নতুন মোড়ক?

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত আইআরজিসি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো, ভূমিকা ও পরিচয় নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের চিন্তা যে ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রে চলছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ইতিহাসবিদ শাহরাম খোলদির মতে, আইআরজিসি কোনো সাধারণ সামরিক বাহিনী নয়। ইরানের সংবিধানের ১৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে এই বাহিনীকে 'ইসলামী বিপ্লব ও তার অর্জনসমূহ রক্ষার' সাংবিধানিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তার ভাষায়, আইআরজিসিকে শুধু একটি সামরিক সংগঠন হিসেবে বিলুপ্ত করা সম্ভব নয়, কারণ এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তির অংশ। তাই সম্পূর্ণ বিলুপ্তির বদলে ক্ষমতাসীনরা বাহিনীটির কাঠামো পরিবর্তন করে নতুন রূপ দিতে পারে।

খোলদির মতে, গত তিন দশকে ইরানে যে সামরিক-নির্ভর ক্ষমতা কাঠামো গড়ে উঠেছে, ভবিষ্যতে সেটিই আরও শক্তিশালী হতে পারে—যেখানে ধর্মীয় শাসনের আড়ালে সামরিক অভিজাতদের প্রভাব আরও বাড়বে।

পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশ আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানের জন্য এই বাহিনী বড় কূটনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি আইআরজিসিকে বৃহত্তর সামরিক কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করা হয় বা নতুন পরিচয়ে হাজির করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় ইরানের জন্য কিছুটা সুবিধা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আইআরজিসিকে বিচ্ছিন্ন করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাও জটিল হয়ে উঠবে।

আইআরজিসি এখন বোঝা: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওমিদ মেমারিয়ানের মতে, আইআরজিসি এখন শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই নয়, দেশের ভেতরেও নেতিবাচক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

তার মতে, অর্থনৈতিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতে আইআরজিসির প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছে।

মেমারিয়ান বলেন, 'আইআরজিসি নামটিই এখন ইরানের জন্য একটি দায়। তাই একই ক্ষমতা কাঠামোকে নতুন নামে উপস্থাপনের চেষ্টা হতে পারে।'

তবে তিনি মনে করেন, এটি কেবল প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের প্রশ্ন নয়; বরং যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানকে নতুন বাস্তবতায় টিকিয়ে রাখার কৌশল নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ভাবনারও প্রতিফলন।

এই বিতর্কের মধ্যেই ইরানের কট্টরপন্থী শিবিরে নতুন বিভাজনও প্রকাশ্যে এসেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সাঈদ জালিলির ঘনিষ্ঠ আল্ট্রা-হার্ডলাইনাররা অভিযোগ করছেন, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে তার বিপ্লবী আদর্শ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন।

তাদের দাবি, যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন আসলে শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস (এফডিডি)-এর ইরান প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলুর মতে, মূল প্রশ্ন নাম পরিবর্তনের নয়, আচরণের।

তার ভাষায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিবর্তন তার কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। আইআরজিসি নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করলেও যদি বিদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন, অর্থনীতিতে আধিপত্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল শক্তি হিসেবে একই ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে প্রকৃত সংস্কার বলা যাবে না।

তিনি পশ্চিমা দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন, বাহ্যিক পরিবর্তনকে যেন তারা বাস্তব সংস্কার হিসেবে ভুল না বোঝে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, আইআরজিসিকে ঘিরে চলমান বিতর্ক আসলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের গভীর সংকটের প্রতিফলন। সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর তেহরান বুঝতে পারছে, আগের মডেলে রাষ্ট্র পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হয়ে উঠছে। তবে একই রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

ফলে আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে- ইরান কি সত্যিই আইআরজিসিকে সংস্কার করবে, নাকি কেবল পুরোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন একটি নাম খুঁজে নেবে?


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
পাপুয়ায় মার্কিন পাইলটকে গুলি করে হত্যা, বিমান  পুড়িয়ে দিলো বিদ্রোহীরা
পাপুয়ায় পাইলটকে হত্যার পর বিমান পুড়িয়ে দিলো বিদ্রোহীরা
বোম্বে হাইকোর্ট
‘নাগরিকদের কি সরকারের দাস বানাতে চান?’- মুম্বাই পুলিশকে আদালতের ভর্ৎসনা
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে যুবকের আত্মাহুতি