আহমেদ জোবায়েরকে নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক মিডিয়া ট্রায়াল?

নিজস্ব প্রতিবেদক
সময় টিভির সাবেক এমডি আহমেদ জোবায়েরের ব্যাংকে ৭৬৫ কোটি টাকা— এমন বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে সম্প্রতি খবর প্রকাশ করে একটি দৈনিক পত্রিকা। প্রতিবেদনের শুরুটা হয় এভাবে— আওয়ামী আমলে সোনার খনি পেয়েছিলেন কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্তে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য বেরিয় আসছে।
এবার বহুল আলোচিত সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমেদর জোবায়েরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৭৬৫ কোটি টাকা জমা হওয়ার তথ্য পেয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এর বাইরে তার নামে ২৫২ কোটি টাকা ঋণ নেয়ারও প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি। পরে আবার রিপোর্টের শেষ অংশে পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— আহমেদ জোবায়েরের নিজে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ৭৬৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে। এর বাইরে তিনি আড়াই শো কোটি টাকার ওপরে ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন। ফলে তার ব্যাংকে স্থিতির পরিবর্তে ঋণ রয়েছে ২৫২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের দুদিন পর আরো একটি পতি্রকা প্রায় একই ধরণের শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দ্বিতীয় পত্রিকাটির রিপোর্টের শিরোনাম— জোবায়েরের অ্যাকাউন্টে ৭৬৫ কোটি টাকা লেনদেন। এই পত্রিকাটি বলছে— … বেশি লেনদেন হয়েছে সময় টিভির সাবেক এমডি আহমেদ জোবায়েরের অ্যাকাউন্টে, যার পরিমাণ ৭৬৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৭৬৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকাই হচ্ছে তার ব্যবসায়িক লেনদেন। এছাড়াও এসব রিপোটে সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী. সাংবাদিক স্বদেশ রায়, লেখক গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে নিয়েও একই ধরণের তথ্য দেয়া হয়। এবং তাদের কারোরই কোনো বক্তব্য নেয় হয়নি। এই দুটি পত্রিকার খবর প্রকাশের মাঝেই একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলও একই ধরণের একটি স্ক্রল সংবাদ প্রচার করে, শুধু আহমেদ জোবায়েরকে নিয়ে।
এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় মাত্র দুই তিনদিনের ব্যবধানে কেন একই ধরণের খবর প্রকাশ করেছে তিনটি গণমাধ্যম। সবারই শিরোনাম এবং রিপোটিংয়ের ভাষাও কেন প্রায় হুবহু একই রকম। এটা কি কাকতালীয়? প্রশ্নগুলো উঠছে কারণ, এসব রিপোটিংয়ের পর আহমেদ জোবায়ের ২রা মার্চ নিজের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আহমেদ জোবায়ের বলছেন— সম্প্রতি কয়েকটি মিডিয়ায় আমার ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৭৬৫ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্যের কথা উল্লেখ করে নিউজ ছাপা হয়েছে। এখানে আমার কোন বক্তব্য নেয়ার প্রয়োজন মিডিয়াগুলো অনুভব করেনি। আর এ কারণেই আমার এ ছোট্ট ব্যাখ্যা।
আমার ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট বলতে সময় টিভি। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৫ বছরে সময় টিভির অ্যাকাউন্টে লেনদেন হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে। কারণ ২০২২ সাল থেকেই সময় টিভির বার্ষিক সেলসের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সরকারকে সর্বোচ্চ পরিমাণ ট্যাক্স— ভ্যাট দেয়া প্রথম তিনটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সময় টিভি একটি। আর যে ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টে এই লেনদেনের কথা উল্লেখ করে আমার কোন বক্তব্য না নিয়েই নিউজ ছাপা হচ্ছে, সে অ্যাকাউন্টগুলোতে সব লেনদেন যৌথ স্বাক্ষরে সম্পাদিত হয়েছে, আমার এবং সময় টিভির ব্যবসায়িক অংশীদার স্বনামধন্য সিটি গ্রুপের একজন প্রতিনিধির যৌথ স্বাক্ষরে। গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত আমার যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত সময় টিভির অ্যাকাউন্টগুলোতে কোন ব্যাংক লোন নাই।
এখানে স্পষ্ট করতে চাই- নিউজে যে টাকা বা ব্যাংক লেনদেনের কথা বলা হচ্ছে তা সবই প্রতিষ্ঠানের, মানে সময় টিভির। আমার ব্যক্তিগত কোনো একাউন্টের লেনদেনের তথ্য নয়।
আহমেদ জোবায়েরর এই স্ট্যাটাস মূর্হুতেই ভাইরাল হয়ে যায়। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ মন্তব্য করতে থাকেন স্ট্যাটাসের নিচে। মাসুদ সিদ্দিকি নামে একজন লেখেন— এটা বাংলাদেশের মিডিয়ার চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। রূপ বদলে এদের বিন্দুমাত্র সময় লাগে না। সামান্য লাভের সামনে মাথা ঝোঁকাতে বা বিক্রি হতে এদের চেয়ে ফাস্টেট রানার পৃথিবীতে দুষ্কর। মাসুদ সিদ্দিকির কমেন্টের পাল্টা উত্তরে নীলু নাজির নামে একজন লেখেনএকদম ঠিক কথা বলেছেন, ধন্যবাদ। মোহাম্মদ কায়কোবাদ আকবর লেখেন— যা খুশি তাই হচ্ছে। এস এম বাবু নামে একজন লেখেন— সাপ্লাইকরা তথ্যভিত্তিক খবর পরিবেশসন কি শুধু আজকের? যুগ যুগ ধরে চলছে। সেটা আপনিও জানেন জো ভাই।
এমন আরো অসংখ্য কমেন্টের মাধ্যমে মানুষ জানান দিচ্ছেন নিজেদের অনুভূতি!
আহমেদ জোবায়েরের স্ট্যাটাস এবং গণমাধ্যম দুটির রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা যায় চটকদার ও বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে প্রতিবেদনের ভেতরে লেখা হয়েছে ভিন্ন কথা। শিরোনাম পড়ে পাঠকের ধারণা হতে আহমেদ জোবায়ের কিংবা অন্যরা মোটা অঙ্কের টাকার মালিক হয়েছেন। কিন্তু পুরো রিপোর্ট পড়লে বোঝা যায় এগুলো মূলত আহমেদ জোবায়ের এবং অন্যদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ব্যাবসায়িক লেনদেনের তথ্য।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপক বলেন— ”এগুলো মূলত মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্র হনন ও সামাজিকভাবে হেয় করার প্রয়াস। দেশে একটি গণ অভ্যুত্থানের পর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করেন দেশের মানুষ। এ ধরণেরর সাংবাদিকতা মানুষের সেই চাওয়াকে অসম্মান করে। গণমাধ্যমগুলোর উচিত কারো স্বার্থে নয়, বরং গণমানুষের কল্যাণের সাংবাদিকতা করা। এটিই জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট।”
ভিওডি বাংলা/এম







