শাপলা চত্বরের অভিযান ছিল পূর্বপরিকল্পিত: চিফ প্রসিকিউটর
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পরিচালিত অভিযান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল বলে দাবি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
সোমবার (২৭ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রবেশমুখে কর্মসূচি পালন করছিলেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে কয়েকজন হেফাজতকর্মী নিহত হওয়ার পর সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈঠক করে। ওই বৈঠকে শাপলা চত্বরের সমাবেশে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়। তার ভাষ্য, পুরো অভিযানটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।
তার দাবি, হেফাজতের নেতাকর্মীরা মধ্যরাতে এমন অভিযান হবে তা অনুমান করতে পারেননি। অনেকেই তখন ঘুমিয়ে ছিলেন, কেউ জিকির-আজকারে ব্যস্ত ছিলেন এবং সেখানে শিশুরাও উপস্থিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে চারদিক থেকে ঘিরে সাউন্ড গ্রেনেড, গ্রেনেড ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে অভিযান চালানো হয়। প্রসিকিউশনের তদন্তে ঘটনাস্থলেই ৩২ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আরও অনেকে আহত হয়েছেন। পরে ভয়ভীতির কারণে অনেক ভুক্তভোগী সামনে আসেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন প্রকাশনা এবং অন্যান্য প্রামাণ্য উপকরণ বিশ্লেষণ করে ৪১ জন অভিযুক্ত ও ৬১ জন নিহতকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে, এমন ব্যক্তিদেরই অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
'এটি জেনোসাইড'
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যার পর শাপলা চত্বরে মধ্যরাতে ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হয়। তার দাবি, একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত এ হামলা পরিকল্পিত ছিল এবং প্রসিকিউশনের মূল্যায়নে এটি গণহত্যা (জেনোসাইড)।
তিনি বলেন, নিরস্ত্র আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে হামলা চালানো হয়েছে। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রচার করা হয়। এসব কারণেই প্রসিকিউশন ঘটনাটিকে জেনোসাইড হিসেবে বিবেচনা করছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, মামলায় জেনোসাইডের পাশাপাশি রাজনৈতিক নিপীড়ন (পলিটিক্যাল পারসিকিউশন) এবং বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগও আনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
অধিকারের প্রতিবেদন নিয়ে যা বললেন
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই প্রতিবেদনকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। বরং প্রসিকিউশনের নিজস্ব তদন্তে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহায়ক (করোবোরেটিভ) প্রমাণ হিসেবে সেটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কেন ৪১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, চাইলে আরও অনেককে আসামি করা যেত। তবে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং ব্যক্তিগত দায় (ইনডিভিজুয়াল রেসপনসিবিলিটি) বিবেচনায় কেবল যাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছে তারাই নয়, যারা অপরাধ প্রতিরোধ করতে পারতেন কিন্তু তা করেননি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে তাদেরও দায় রয়েছে। বাহিনীর প্রধানদের বিরুদ্ধে কমান্ড রেসপনসিবিলিটির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।
এছাড়া মতিঝিল থানার সব পুলিশ সদস্যকে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামি
চিফ প্রসিকিউটর জানান, ৪১ অভিযুক্তের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে অন্য মামলায় কারাগারে রয়েছেন। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে এবং অন্য মামলায় আটক ব্যক্তিদের এ মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবু প্রসঙ্গে
সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো ঘটনাসংশ্লিষ্ট তথ্য গোপন করা, বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ এবং অপরাধ আড়াল করতে সহায়তা করা। প্রসিকিউশনের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য (প্রাইমা ফেসি) প্রমাণ রয়েছে। তবে আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ তারা পাবেন।
'তদন্তে জেনোসাইডের প্রমাণ পাওয়া গেছে'
জুলাই-আগস্টের অন্যান্য মামলায় জেনোসাইডের অভিযোগ না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আগে কে কী বলেছেন, সেটি তার বিবেচ্য বিষয় নয়। প্রসিকিউশনের তদন্তে এটি জেনোসাইডের ঘটনা বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এ বিষয়ে বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিচার হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তরা আইনের সুবিধা পাবেন।
ভিওডি বাংলা/এমএস









মন্তব্য