সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত সন্দেহ? বাড়ছে ‘রিলেশনশিপ ওসিডি’ আক্রান্তের সংখ্যা

প্রিয় মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই চলছে। তবু মনে হচ্ছে, সত্যিই কি তাকে ভালোবাসেন? তিনি কি আপনার জন্য সঠিক মানুষ? তিনি যদি অন্য কারও চেয়ে কম আকর্ষণীয় হন? কিংবা আপনি যদি তাকে ছেড়ে চলে যান বা প্রতারণা করে ফেলেন?
এ ধরনের প্রশ্ন মাঝে-মধ্যে অনেকের মনেই আসে। কিন্তু যখন এসব সন্দেহ দিনের পর দিন তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে, তখন সেটি হতে পারে রিলেশনশিপ ‘অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের (ওসিডি বা আরওসিডি)’ — একটি বিশেষ ধরন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই মানসিক সমস্যার বিষয়ে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
‘ঘর থেকে বের হতেও ভয় লাগত’
যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের ২৪ বছর বয়সী সোফিয়া এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি সুখী সম্পর্কে রয়েছেন। কিন্তু তার মনের ভেতর চলতে থাকা সন্দেহের কারণে সেই সম্পর্ক উপভোগ করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তার ভাষায়, "আমি এতটাই ভয় পেতাম যে বাইরে গেলে হয়তো প্রেমিকের সঙ্গে প্রতারণা করে ফেলব।"
তিনি জানান, একসময় পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে কাজে যাওয়া বন্ধ করে দেন। সারাদিন বিছানায় শুয়ে চ্যাটজিপিটিকে শত শত প্রশ্ন করতেন, শুধু নিজের উদ্বেগ কমানোর আশায়।
সোফিয়ার ভাষায়, "এটি মানসিক নির্যাতনের মতো। মাথার ভেতরে যেন একটি কণ্ঠ সারাক্ষণ সম্পর্কের খুঁত খুঁজে বেড়ায়। আপনি জানেন এগুলো সত্য নয়, তবুও সেগুলো থামে না।"
কী এই রিলেশনশিপ ওসিডি?
দক্ষিণ লন্ডন ও মডসলে এনএইচএস ট্রাস্টের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডেভিড ভিল বলেন, সাধারণ সম্পর্কে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রিলেশনশিপ ওসিডিতে সেই সন্দেহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তার মতে, "এই চিন্তাগুলো মানুষের দিনের পর দিন মানসিক শক্তি নষ্ট করে, তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং মানুষকে বারবার সঙ্গীর কাছ থেকে আশ্বাস চাইতে বা সম্পর্ক পরীক্ষা করতে বাধ্য করে।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি একই প্রশ্ন বারবার ভাবেন, নিজের অনুভূতি নিয়ে সন্দেহ করেন এবং আশ্বস্ত হওয়ার জন্য একই আচরণ বারবার পুনরাবৃত্তি করেন।
দুই ধরনের সমস্যা
ইসরায়েলের রাইখম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক গাই ডোরনের মতে, রিলেশনশিপ ওসিডি সাধারণত দুইভাবে প্রকাশ পায়।
প্রথমটি সম্পর্ককেন্দ্রিক, যেখানে ব্যক্তি নিজের অনুভূতি নিয়েই সন্দেহে ভোগেন—তিনি সত্যিই ভালোবাসেন কি না বা সম্পর্কটি ঠিক কি না।
দ্বিতীয়টি সঙ্গীকেন্দ্রিক, যেখানে সঙ্গীর ছোটখাটো ত্রুটি নিয়েই অতিরিক্ত চিন্তা শুরু হয়।
তিনি বলেন, সম্পর্কের নতুন ধাপ—যেমন প্রেমের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, একসঙ্গে থাকা বা বিয়ে—অনেক সময় এই সমস্যার সূচনা ঘটাতে পারে।
ছোট বিষয়ও বড় সন্দেহের কারণ
সোফিয়ার ওসিডি আগে জীবাণুর ভয় এবং স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগকে কেন্দ্র করে ছিল। দিনে অন্তত ৩০ বার হাত ধুতেন তিনি।
পরে প্রেমিকের সঙ্গে পরিচয়ের এক মাসের মাথায় সম্পর্ক যখন গভীর হতে শুরু করে, তখন তার ওসিডি নতুন রূপ নেয়।
তিনি বলেন, প্রেমিকের পোশাক যদি তার ভালো না লাগত, কিংবা নতুন কোনো হেয়ারস্টাইল করতেন, তাহলেই মনে হতো হয়তো এই সম্পর্ক ঠিক নয়।
"মস্তিষ্ক আমাকে বারবার বলত সম্পর্ক শেষ করে দিতে। অথচ আমি জানতাম, আমি সেটা চাই না।"
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি দায়ী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রিলেশনশিপ ওসিডির উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অধ্যাপক ডোরন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ককে অতিরঞ্জিতভাবে নিখুঁত হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে অনেকেই নিজের বাস্তব সম্পর্ককে সেই কল্পিত ছবির সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন।
সোফিয়াও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন।
"অনলাইনে সব দম্পতিকেই নিখুঁত মনে হয়। বাস্তবে কোনো সম্পর্কই এমন নয়।"
‘যখন জানবেন, তখনই বুঝবেন’—এই ধারণাও চাপ তৈরি করে
ব্রিস্টলের ২৪ বছর বয়সী গ্রেসি সাত বছর ধরে রিলেশনশিপ ওসিডিতে ভুগছেন।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়—'যখন সঠিক মানুষকে পাবেন, তখন নিজেই বুঝে যাবেন' কিংবা 'দ্য ওয়ান' খুঁজে পাওয়ার মতো বাক্য।
এই ধারণাগুলো তাকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে।
তার ভাষায়, "আমরা হয়তো সুন্দর সময় কাটাচ্ছি, কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখন প্রশ্ন ঘুরছে—এই মানুষটিই কি আমার জন্য সঠিক?"
গ্রেসি বলেন, রিলেশনশিপ ওসিডি মানে এই নয় যে কেউ তার সঙ্গীকে ভালোবাসেন না।
বরং, "ওসিডি সাধারণত মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়টিকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়।"
চিকিৎসা ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, রিলেশনশিপ ওসিডির চিকিৎসা সম্ভব।
সোফিয়া ও গ্রেসি দুজনই ওষুধ এবং কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) নিয়েছেন। পাশাপাশি অনলাইনে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও শিক্ষামূলক ভিডিও থেকেও তারা রোগটি সম্পর্কে জেনেছেন।
ওসিডি অ্যাকশন নামে যুক্তরাজ্যের একটি মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যদি অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা বা সন্দেহ দৈনন্দিন জীবন, সম্পর্ক বা কাজকে ব্যাহত করে, তাহলে প্রথমেই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
অধ্যাপক গাই ডোরনের পরামর্শ, বারবার সঙ্গীকে পরীক্ষা করে আশ্বস্ত হওয়ার চেষ্টা না করে সেই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডেটিং অ্যাপের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
সচেতনতা বাড়লেও প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওসিডিতে আক্রান্ত মানুষের একটি অংশ রিলেশনশিপ ওসিডিতে ভোগেন। যদিও এটি আলাদাভাবে নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা জানা যায় না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গবেষণা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ এই সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারছেন এবং চিকিৎসা নিতে এগিয়ে আসছেন।
সূত্র: বিবিসি
ভিওডি বাংলা/আরআর/আ








মন্তব্য