নতুন বিতর্কে আর্জেন্টিনা, তদন্ত চায় ব্রিটিশ সরকার

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করার আনন্দের মাঝেই নতুন বিতর্কে জড়িয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে গ্যালারি থেকে দেয়া মালভিনাস আর্জেন্টিনার লেখা একটি ব্যানার হাতে নিয়ে উদযাপন করেন লিওনেল স্কালোনির দলের খেলোয়াড়রা। এরপরই আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কার্যালয় জানায়, বিষয়টি ফিফার তদন্ত করা উচিত। ব্রিটিশ সরকারের দাবি, বিশ্বকাপের মঞ্চে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শন করা অনুচিত এবং এটি ফিফার শৃঙ্খলাবিধিরও লঙ্ঘন হতে পারে। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর উদযাপনের সময় আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা যে ব্যানারটি হাতে নেন, তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’ যার অর্থ ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’।
যে দ্বীপপুঞ্জকে ব্রিটেন ফকল্যান্ড আইল্যান্ডস নামে চেনে, আর্জেন্টিনা সেটিকে ইসলাস মালভিনাস বলে উল্লেখ করে এবং দীর্ঘদিন ধরেই এর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ব্যানার প্রদর্শন নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ব্রিটেন।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র বলেন, ‘বিশ্বকাপ হয়তো আমাদের নয়, কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ অবশ্যই আমাদের। দ্বীপবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই এখানে চূড়ান্ত, আর ফকল্যান্ডের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার কখনো বদলাবে না।’
ব্রিটিশ বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল খেলোয়াড়দের এই আচরণকে ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত’ বলে মন্তব্য করেন। এরপরই স্টারমারের ফিফার তদন্তের দাবিকে সমর্থন জানান তিনি।
ফিফার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী, স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক, আদর্শিক, ধর্মীয় বা আপত্তিকর বার্তা প্রদর্শন নিষিদ্ধ। এমন অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় বা জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।এ ধরনের অপরাধে সাধারণত ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
একই কারণে আগেও শাস্তি পেয়েছে আর্জেন্টিনা। ২০১৪ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলগামী প্রস্তুতি ম্যাচেও একই স্লোগানসংবলিত ব্যানার প্রদর্শন করেছিল আর্জেন্টিনা। পরে ফিফা আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ৩০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করেছিল।
এছাড়া ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে কসোভো নিয়ে রাজনৈতিক ব্যানার টানানোর অভিযোগে সার্বিয়ান ফুটবল ফেডারেশনকে ২০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা করেছিল ফিফা। আরও আগে, ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে জাপানকে হারানোর পর ‘ডোকু ইজ আউয়ার টেরিটরি’ লেখা ব্যানার হাতে নেয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলার পার্ক জং-উকে ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা। সেই রায়ে ফিফা বলেছিল, এ ধরনের আচরণ ‘কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।’
এদিকে বিতর্কিত এ ব্যানার প্রদর্শন নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস। ২০২২ সাল থেকে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলা ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো বলেন, ‘আমরা আর্জেন্টিনার মানুষকে হতাশ করতে পারতাম না।’
অন্যদিকে লিয়ান্দ্রো পারেদেস বলেন, ‘এটা আমাদের ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত সবার জন্যই কষ্টের। আমরা জানতাম, তাদের জন্যও আমরা খেলছিলাম।’
ফকল্যান্ড বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের বিরোধ প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো। আর্জেন্টিনার দাবি, ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন অবৈধভাবে দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ দখল করে। অন্যদিকে ব্রিটেন বলছে, ১৭৬৫ সাল থেকেই তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি রয়েছে এবং ১৮৩৩ সালে তারা শুধু নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা দ্বীপগুলো দখল করলে শুরু হয় ১০ সপ্তাহের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে প্রাণ হারান ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনাসদস্য এবং তিনজন দ্বীপবাসী।
দক্ষিণ আটলান্টিকের এই দ্বীপপুঞ্জে বর্তমানে প্রায় ৩,৫০০ জনের বসবাস। এটি যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ৪৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এ ঘটনার মধ্যেই আবারও আলোচনায় এসেছে ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। এই বিশ্বকাপেই যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড দেখার পরও পরের ম্যাচে খেলার অনুমতি পাওয়ায় ফিফার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ উঠেছিল। ফিফা তার এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের পরীক্ষামূলক স্থগিতাদেশে রূপান্তর করে, যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
এদিকে সোমবার রাতে নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। গ্যালারিতে থাকার কথা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইরও। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে তাই মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মালভিনাস ইস্যুও এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য